আজ রবিবার,৭ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ,২২শে নভেম্বর ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

Sample Image of Homeopathy

হোমিওপ্যাথিক ওষুধ কিভাবে কাজ করে তা জেনে নিন

হোমিওপ্যাথিক ওষুধ যেভাবে কাজ করে


সানরাইজ৭১ এ সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি। আশা করছি, সবাই ভালো আছেন। আজ আমরা আলোচনা করবো হোমিওপ্যাথিক ওষুধ কিভাবে কাজ করে তা নিয়ে। আলোচনাটি একটু বড় আকারের হবে। আশা করছি, সময় নিয়ে পুরো লেখাটি পড়বেন। তো আর কথা নয় – সরাসরি মূল আলোচনায় প্রবেশ করছি।

 

হোমিওপ্যাথিক ওষুধ শরীরে প্রবেশ করে প্রথমতঃ একটি রোগের সৃষ্টি করে। যদি সেই রোগ শরীরস্থ রোগের চেয়ে অধিক শক্তিশালী হয় তবে তা উক্ত রোগের স্থান অধিকার করে বসে, ফলে শারিরীক পীড়া বা ব্যাধি সঙ্গে সঙ্গে নিজ অধিকৃত স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।

কেননা দুই বস্তু একই সময় একই স্থান দখল করতে পারে না। শারীরিক পীড়া শরীর থেকে বের হওয়ার সময় ওষুধজনিত পীড়াকে নষ্ট করে বের হয়ে আসে।

শারিরীক পীড়া যতই বলবান ও শক্তিশালী হোক না কেন যদি আমরা তার চেয়েও অধিক পাওয়ারের ওষুধ ব্যবহার করি তাহলেই উক্ত রোগ আরোগ্য করতে সক্ষম হবে। হোমিওপ্যাথিক ওষুধ যতই উচ্চ শক্তিসম্পন্ন হয় ততই অধিকতর শক্তিশালী ও দ্রুত কার্যকর হয়।

হোমিওপ্যাথিক ওষুধের শক্তি বলতে বুঝায় ওষুধের পটেনটাইজেশন। শততমিক পদ্ধতির হোমিওপ্যাথিক ওষুধের শক্তি এক অর্থাৎ হোমিওপ্যাথিক ওষুধের মাদার টিংচার এক ফোটা + ৯৯ ফোটা রেক্টিফাইড স্পিরিট।

আবার হোমিওপ্যাথিক ওষুধের শক্তি বলতে বুঝায় পূর্বের শক্তিকৃত ওষুধের এক ফোটা + ৯৯ ফোটা রেক্টিফাইড স্পিরিট অর্থাৎ দুই শক্তিতে ওষুধের পরিমাণ দশ হাজার ভাগের মধ্যে দুই ভাগ – ২:১০০০।

রেক্টিফাইড স্পিরিটের মধ্যে হোমিওপ্যাথিক ওষুধ এটোমিক শক্তিতে থাকে। ডায়লেশন বা ডায়ালেশন শব্দটি হোমিওপ্যাথিক ওষুধের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা ঠিক নয়। কেননা এই শব্দটি দ্বারা শক্তি কমানো বুঝায়।

এ শব্দটি অ্যালোপ্যাথিক ওষুধের ক্ষেত্রেই একমাত্র ব্যবহার করা যেতে পারে, কেননা ডায়লেশনের মাধ্যমে অ্যালোপ্যাথিক ওষুধের শক্তিকে কমানো হয়।

উদাহরণস্বরুপঃ এক আউন্স সালফিউরিক এসিডের সাথে নয় আউন্স পানি মিশিয়ে সালফিউরিক এসিডের পাওয়ার কমানো হয়। সালফিউরিক এসিডের সাথে পানি না মিশিয়ে গলদ্ধকরণঃ করলে গলা জ্বলে যায় বলে তার তীব্রতা কমানোর জন্য পানির মিশ্রণ করা হয়।

আর এই জন্যই এই প্রক্রিয়াকে ডায়লেশন বলা হয়। কিন্তু হোমিওপ্যাথিক ওষুধকে পটেনটাইজেশন প্রক্রিয়ায় ওষুধের পাওয়ার বাড়ানো হয়। এই বিষয়টি হোমিওপ্যাথিক শাস্ত্রে অভিজ্ঞ ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ সহজে বিশ্বাস করতে চান না।

ওষুধ শরীরে প্রবেশ করে প্রথমতঃ একটি রোগের সৃষ্টি করে। যাদের বিশ্বাস হয় না তারা যদি সালফার ২০০ অথবা সোরিনাম ২০০ শক্তির এক ড্রাম দৈনিক ২/৩ বার এক ফোটা করে ১০/১৫ দিন পর্যন্ত সেবন করেন তাহলে দেখা যাবে যে ১০/১৫ দিন পরে তাদের শরীর পাঁচড়ায় ভরে গেছে।

তখন অবশ্য বিশ্বাস না করে কোনো উপায় নেই। কিন্তু যদি কেউ একেবারে এক ড্রাম সালফার ২০০ অথবা সোরিনাম ২০০ সেবন করে তখন তা কেবল এক ডোজেরই কাজ করবে।

কেননা একবারে কারো মস্তকে যদি কেউ এক বদনা পানি ঢেলে দেয় তাহলে তাতে তার একবার মস্তক ধুয়ে ফেলার কাজ ছাড়া আর কিছুই হয় না। কিন্তু যদি তার মস্তকে ফোটা ফোটা করে এক বদনা পানি ঢালা হয় তাহলে অবশ্যই তার সর্দি, কাশি অথবা জ্বর হবে।

হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা’য় পটেনটাইজেশন প্রক্রিয়ায় ওষুধের পাওয়ার বা শক্তি বাড়ানো হয় এবং যার কোনো শক্তি নেই তারও শক্তি প্রকাশ পায়।

এটার উদাহরণ লাইকোপোডিয়াম ওষুধ। এই ওষুধটি শক্তিকৃত হয়ে কত অসাধ্যকে সাধন করেছে তার শেষ নেই। আর এই বিষয়গুলো সেই পর্যন্ত আপনি বুঝতে পারবেন না যতক্ষণ না আপনি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় প্রবৃত্ত না হবেন।

আবার, সাইলিশিয়া অর্থাৎ বালি; এটা যে এক প্রকার ওষুধ তা কেউ জানতেন না। অথচ মহাত্মা হ্যানিম্যান এটারও কার্যকারিতা আবিষ্কার করে গেছেন এবং বহু অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন।

এরূপ উদাহরণ আরও অসংখ্য ওষুধের ক্ষেত্রে দেয়া যায়। যেমন – সালফার, সোরিনাম, টিউবারকুলিনাম ইত্যাদি ওষুধগুলো অনেক অসাধ্য সাধন করেছে। এটা জেনে রাখা উচিত যে, সকল ওষুধকেই আমরা পীড়ার চেয়ে অধিকতর শক্তিশালীরূপে তৈরী করতে পারি।

কোন স্থানে ওষুধ প্রয়োগ করলে যদি তা কার্যকরী কোনো ফল না দেয়, তখন আমরা এটা অপেক্ষা অধিকতর উচ্চতর শক্তির ওষুধ প্রয়োগ করি। জানা প্রয়োজন, ৬, ৩০ ও ২০০ কিংবা তদুর্ধ্ব শক্তির ওষুধের মধ্যে কোথায় কোন শক্তির ওষুধ প্রয়োগ করা হয়।

সর্দি, কাশি, জ্বর, পাতলা পায়খানা, আমাশয়, পেট বেদনা, রক্তস্রাব প্রভৃতি পীড়ায় ৬ ও ৩০ শক্তির ওষুধ ব্যবহার করাই শ্রেয়।

আবার, মাথাধরা, স্নায়ুশুল, জ্বর, মানসিক বিকার, আত্মহত্যার প্রবৃত্তি, কোনো কিছুর অলীক ভয়, অলীক সন্দেহ, উম্মাদগ্রস্থ ইত্যাদির ক্ষেত্রে ২০০ শক্তির ওষুধ শ্রেয়।

অস্বাভাবিক অনুভূতি যেমন – রোগী অনুভব করে যে তার মুখে মাকড়সার জাল লেগেই রয়েছে, গলার ভেতর কি যেন আটকে আছে ইত্যাদি ক্ষেত্রে উচ্চতর শক্তির ওষুধ প্রয়োগ করাই ভালো।

সব রোগের বেলায় সাধারণতঃ ৬, ৩০ ও ২০০ শক্তির ওষুধ প্রয়োগ করা যায়। আবার, পীড়িত দেহের রস ও রক্ত হতে প্রস্তুত নোসোড ওষুধ যেমন – ভ্যাকসিসিনাম, ভিরিওলিনাম, সোরিনাম, ডিফথেরিনাম, মেডোরিনাম, সিফিলিনাম ইত্যাদি ওষুধের শক্তি ২০০ বা তদুর্ধ্ব প্রয়োগ করতে হয়।

কলেরা ও এর মতো মারাত্মক রোগের বেলায় ৬ ও ৩০ শক্তির ওষুধ ১০ থেকে ১৫ মিনিট অন্তর প্রয়োগ করতে হয়। রোগের উপশম হতে আরম্ভ করলে অনেকক্ষণ পরপর পরিবর্তিত শক্তিতে ওষুধ সেবন করতে হয়।

ডোজ পূর্ণ হওয়ার পরেও যদি উপকার হতে না দেখা যায়, তবে অন্য ওষুধ নির্বাচন করতে হবে। আবার তরুণ রোগের বেলায় এক মাত্রা ওষুধ দিয়ে তিন ঘন্টার মধ্যে উপকার না দেখলে আর একমাত্রা ওষুধ দিয়ে কোনো ফলাফল আসে কিনা তা দেখা যেতে পারে।

যদি কোনরূপ উপকার না হয় তবে ওষুধ পরিবর্তন করার বিষয় বিবেচনা করতে হবে। অপরদিকে, ওষুধ প্রয়োগের ফলে কোনোরূপ উপকার হচ্ছে বুঝতে পারা গেলে তবে যতক্ষণ উপকার হতে থাকে ততক্ষণ আর কোনো ওষুধ পরিবর্তন করতে হবে না।

যখন দেখতে পাওয়া যায় যে, আর কোনো উপকার হচ্ছে না তখন ঐ একই ওষুধের উচ্চ শক্তির এক মাত্রা প্রয়োগ করতে হবে। প্রথম একমাত্রা ওষুধ দিয়ে যদি শরীরে পীড়ার পরিমাণ বেড়ে যায় এবং তা যদি রোগীর পক্ষে অসহ্য হয়ে ওঠে তবে সেই একই ওষুধের আরও এক মাত্রা প্রয়োগ করা হলে উক্ত যন্ত্রণা কমে যাবে। বিষয়টি কিন্তু সত্যিই আশ্চর্যজনক।

যারা এ বিষয়ে অনভিজ্ঞ, তারা এই ক্ষেত্রে ওষুধের ক্রিয়ানাশক ওষুধটিই ব্যবহার করে থাকেন, তাতে ওষুধজনিত প্রতিক্রিয়াটি কমে যায় বটে কিন্তু শারীরিক পূর্ব রোগের আর কোন ক্রিয়া হওয়ার সম্ভাবনা বা আশা থাকে না।

তারা যদি এইসব ক্ষেত্রে ওষুধের ক্রিয়ানাশক ওষুধটি ব্যবহার না করে ঐ একই ওষুধের আরও একমাত্রা প্রয়োগ করতেন তাহলে সব দিক থেকেই রক্ষা হতো। অর্থাৎ ওষুধের প্রতিক্রিয়াটিও কমে যায় এবং একই সাথে মূল রোগও কমে যেতে আরম্ভ করে।

সেজন্য এক ডোজ ওষুধ দিয়ে ২/৩ ঘন্টা অন্তর অন্তর এক মাত্রা করে সুগার অব মিল্ক দিতে হয়। কেননা, অ্যালোপ্যাথি, হেকেমী ও কবিরাজী ওষুধ ক্রমানু্ক্রমিক ব্যবহার করে লোকে এরূপ অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে, ২/৩ ঘন্টা অন্তর অন্তর ওষুধ না দিলে তাদের মনের তৃপ্তি হয় না।

সুতরাং হোমিওপ্যাথিক শাস্ত্র মতে, সমস্ত রোগীকেই এরূপভাবে সুগার অব মিল্ক খাওয়ানো হয়। এমনকি নিজের বাবা-মায়ের চিকিৎসার বেলাও এই নিয়ম পালন করা উচিত।

যিনি এটা না করবেন তার হাতের রোগী অন্যত্র চলে যাবেন – এটাই স্বাভাবিক। উল্লেখ্য, অনেক চিকিৎসক একই ওষুধ একই শক্তিতে বার বার প্রয়োগ করেন। এটা কিন্তু ঠিক নয়; তবে সাক্কাসন পদ্ধতিতে দেয়া যেতে পারে। কারণ, পরিবর্তিত পরিবেশে বা খাদ্যাভাসে ওষুধের শক্তি অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায়।

পুরাতন পীড়ায় এক মাত্রা ওষুধ দিয়ে ১৫ দিন অপেক্ষা করতে হবে। তাতে কোনো উপকার না হলে ওষুধ পরিবর্তন করে দিতে হবে। সামান্য উপকার বোধ করলে আর ওষুধ পরিবর্তন করতে হবে না এবং যতক্ষণ উপকার হতে থাকবে ততক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে।

নানা প্রকার ওষুধ সেবনের পরে রোগী বিফল মন নিয়ে শেষ বারের মতো হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা করতে আসে। তখন একমাত্রা ওষুধ দিয়ে তিন ঘন্টা পর পরিবর্তিত শক্তিতে পূণরায় আরও এক মাত্রা দিয়ে পূর্ব নিয়মে ১৫ দিন অপেক্ষা করতে হবে।

পুরাতন পীড়ার জন্য দীর্ঘকাল কাজ করে যে সকল ওষুধ তাদের ব্যবহার করতে হবে। নতুন বা তরুণ পীড়ায় যেসকল ওষুধ অল্পকাল কাজ করে তাদের ব্যবহার করতে হবে।

হোমিওপ্যাথিক ওষুধ শরীরের উপর দুই তিন ঘন্টা থেকে শুরু করে দুই তিন মাস পর্যন্ত কাজ করতে পারে। দুই তিন ঘন্টা যে সকল ওষুধ শরীরের উপর কাজ করে তা স্বল্পকালীনক্রীয় ওষুধ আর যেসকল ওষুধ শরীরের গভীরে প্রবেশ করে দীর্ঘকাল কাজ করে তা দীর্ঘকালক্রীয় ওষুধ। সাধারণতঃ পুরাতন পীড়ায় গর্ভীর ও দীর্ঘক্রীয় ওষুধগুলোই ব্যবহার করতে হয়।

 

আজকের আলোচনা এখানেই শেষ করা হলো। আশা করি, আপনারা বুঝতে পেরেছেন যে হোমিওপ্যাথিক ওষুধ কিভাবে কাজ করে। আবারও নতুন কোনো স্বাস্থ্য টিপস নিয়ে হাজির হবো অন্য কোনো দিন। সবাই সুস্থ্য, ‍সুন্দর ও ভালো থাকুন। নিজের যত্ন নিন এবং সাবধানে থাকুন।

এই পোস্টটি যদি আপনার কাছে ভালো লাগে এবং প্রয়োজনীয় মনে হয় তবে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না যেন।

 

[বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যগুলো কেবল স্বাস্থ্য সেবা সম্বন্ধে জ্ঞান আহরণের জন্য। অনুগ্রহ করে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ সেবন করুন। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবনে আপনার শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি হতে পারে। প্রয়োজনে, আমাদের সহযোগিতা নিন। আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ।]

অ্যাডমিনঃ

আপনাদের সাথে রয়েছি আমি মোঃ আজগর আলী। ছোট বেলা থেকেই কম্পিউটারের প্রতি খুব আগ্রহ ছিল। মানুষের সেবা করারও খুব ইচ্ছে। আর তাই গড়ে তুলেছি স্বাস্থ্য সেবা বিষয়ক ওয়েবসাইট সানরাইজ৭১। আশা করছি, আপনারা নিয়মিত এই ওয়েবসাইট ভিজিট করবেন এবং ই-স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণ করবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     আরও পড়ুন:

সাম্প্রতিক পোস্টসমুহ

আজকের দিন-তারিখ

  • রবিবার (বিকাল ৪:৪৬)
  • ২২শে নভেম্বর ২০২০ খ্রিস্টাব্দ
  • ৬ই রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরি
  • ৭ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ (হেমন্তকাল)