আজ মঙ্গলবার,৯ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ,২৪শে নভেম্বর ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

Sample Image of Liver

লিভার সিরোসিস রোগের কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা

লিভার সিরোসিস


সানরাইজ৭১ এ সবাইকে স্বাগতম। আশা করছি, সবাই ভালো আছেন। আজ আমরা আলোচনা করবো লিভার সিরোসিস রোগ নিয়ে। আশা করি, আলোচনাটি তথ্যবহুল হবে এবং আপনাদের কাজে লাগবে। তো আর কথা নয় – সরাসরি যাচ্ছি মূল আলোচনায়।

 

লিভার সিরোসিস একটি কঠিন ব্যাধি। এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ক্রম অগ্রসরমান রোগ। এই রোগকে আমরা যকৃতকোষের অধোগমনজনিত কোষ বিনষ্ট, কোষ পুনঃনির্মাণ এবং কোষস্থলে অংশুময় অন্তর প্রতিস্থাপনের ফলশ্রুতি বলতে পারি।



অতিরিক্ত মদ্যপানকে এই রোগের একটি কারণ বলে উল্লেখ করা হলেও খাদ্যে প্রোটিনের অপর্যাপ্ততা এবং বি-ভিটামিনের অভাব আমাদের দেশে লিভার সিরোসিসের প্রধান কারণ। কোলন, মেথিওনিন প্রভৃতি লাইপোট্রপিক উপাদান যকৃতে চর্বির অনু্প্রবেশ রোধ করে।

তাই এগুলোর অভাব যকৃতকোষে চর্বি জমা করে সিরোসিস জনিত পরিবর্তনের অতি প্রাথমিক পরিবেশ সৃষ্টি করে।

সিরোসিস রোগীর শতকরা প্রায় দশজনের অবশ্য পিত্তনালীবদ্ধতা বা যকৃতের জীবাণুঘটিত প্রদাহের পূর্ব ইতিহাস পাওয়া যায়।

এই রোগে লিভার বড় হয়ে যায় এবং লিভারের আকারের পরিবর্তন ঘটে। প্রথমদিকে লিভার বড় এবং শক্ত হয়।

 

লিভার সিরোসিসের প্রকারভেদঃ

লিভার সিরোসিস বা সিরোসিস অব লিভার দুই প্রকার। সেগুলো হলোঃ (ক) পোর্টাল সিরোসিস এবং (খ) হাইপারট্রোফিক বিলিয়ারী সিরোসিস।

এখন আমরা এই দুই প্রকার লিভার সিরোসিস নিয়ে আলোচনা করবো।

 

(ক) পোর্টাল সিরোসিসঃ দীর্ঘদিন যাবত অখাদ্য, কুখাদ্য কিংবা অপুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করলে ধীরে ধীরে এই রোগে আক্রান্ত হয়।

ক্রমাগত রাত্রি জাগরণ, মদ্যপান ও ধুমপান করলেও এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে। অন্যদিকে, হেপাটাইটিজ রোগ থেকেও এই রোগের বিকাশ ঘটে থাকে।

 

কেন এই পোর্টাল সিরোসিস হতে পারে?

১। দীর্ঘদিন যাবত হেপাটাইটিজ রোগে ভুগলে এই সিরোসিস হতে পারে।

২। অনেক সময় কোলসিসটাইসিস থেকেও সিরোসিস হয়।

৩। ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর প্রভৃতি রোগ থেকে হেপাটাইটিস রোগ এবং পরে তা সিরোসিসে রূপ নিতে পারে।

৪। মদ্যপানের জন্য সিরোসিস হতে পারে।

৫। দীর্ঘ দিনের পিত্তনালীর ব্যথা হলে সিরোসিস হতে পারে।

৬। Viral হেপাটাইটিস B থেকেও লিভার সিরোসিস রোগ হতে পারে।

৭। Infection (জীবাণু দূষণ) থেকে পোর্টাল বিলিয়ারী সিরোসিস হতে পারে।



 

লক্ষণগুলো যেমন হয়ঃ

১। পোর্টাল রক্ত সঞ্চালনে বাধার সৃষ্টি হয়ে যকৃতের আকার বদলিয়ে যায়। প্রথমে বড় ও পরে ছোট হয়। এর ফলে যকৃত ও পাকস্থলী হতে রক্তক্ষরণ এবং পেটে পানি জমে উদরী রোগের সৃষ্টি হয়।

২। লিভারে ব্যথা, ডান দিকে ব্যথা, ডান কাঁধে ব্যথা, ডান বুকে এবং ডান পেটে ব্যথা থাকে।

৩। জ্বর থাকতে পারে। মুখের স্বাদ তিতা হয়। অজীর্ণ এবং অক্ষুধা দেখা দেয়।

৪। দীর্ঘদিন যাবত এই রোগ সুপ্ত অবস্থায় থাকে। অনেক সময় কয়েক বছর পর্যন্ত রোগের কোন লক্ষণ প্রকাশ নাও পেতে পারে।

৫। অনেক ক্ষেত্রে এই রোগে আক্রান্ত রোগীর লক্ষণ প্রকাশ না পেলেও রোগীর ক্ষুধাহীনতা, বমি বমি ভাব, বমি, পুরাতন বদহজম, পেট ফাঁপা, ঢেকুর কিংবা কোষ্ঠকাঠিন্য থাকে।

৬। দেহের রং মেটে এবং হালকা হলুদ বর্ণের হয়।

৭। পুরুষত্বহীনতা, ধ্বজভঙ্গ ইত্যাদি থাকতে পারে।

৮। এমনিভাবে সুদীর্ঘকাল রোগে ভোগার জন্য রোগীর যকৃত অকেজো হয়ে পড়ে এবং হঠাৎ রোগীর মৃত্যু হয়।

 



(খ) হাইপারট্রোফিক বিলিয়ারী সিরোসিসঃ সাধারণত মধ্যম বয়সের লোকেরা এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে বা হয়ে থাকে। এই রোগ হঠাৎ আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়। পিত্তনালীর পথে বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার জন্য এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

আক্রান্ত ব্যক্তির লিভার বাড়ে এবং নরম হয়। নরম সেলগুলো ফাইবারে পরিণত হয় এবং লিভার শক্ত হয়।

 

লক্ষণগুলো যেমন হয়ঃ

১। এই রোগে আক্রান্ত রোগীর জ্বর হয়।

২। যকৃত এবং প্লীহা বৃদ্ধি পায়।

৩। দেহের রং হলুদ বর্ণ হয় ধীরে ধীরে এবং জন্ডিসে আক্রান্ত হয়।

৪। মাঝে মাঝে পিত্তবমি হয়।

৫। শীর্ণতা, দুর্বলতা ও মারাত্মক রক্তশূন্যতা দেখা দেয়।

৬। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত জল উদরী রোগেও আক্রান্ত হতে পারে।

 

চিকিৎসাঃ

এই রোগে যেসব ওষুধ ব্যবহার করা হয় তার কিছু তালিকা নিচে দেয়া হলো। আপনাকে অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। এখানে শুধু জানার তাগিদে ওষুধের নামগুলো উল্লেখ করা হলো।

জেনে রাখা ভালো, আরোগ্য করার মতো কোনো চিকিৎসা নেই। উপসর্গ বা লক্ষণগুলোর প্রতি নজর রেখে চিকিৎসা করতে হয়। পুষ্টিকর ও কার্বোহাইড্রেট খাবার খেতে হবে। রাত্রি জাগরণ, দুশ্চিন্তা, মদ্যপান বা ধুমপান বন্ধ রাখতে হবে।

 

১। রক্ত বর্ধক ওষুধ খেতে দিতে হবে। যেমন,

Sy Ferabolin or,

Sy Dyaferon or,

Sy Ferromin or,

Sy Glucoferon or,



Sy Fercon.

মাত্রাঃ প্রত্যহ খাবার পরে ½ চামচ ওষুধ সেব্য।

অথবা, উপরোক্ত ওষুধ ছাড়াও দুর্বলতার জন্য নিম্নোক্ত ওষুধগুলো ব্যবহার করা যায়। যেমন,

Inj Vitamin-B Complex or,

Inj Opsovit or,

Inj Beconex or,

Inj Fidaplex or,

Inj B-50 forte.

মাত্রাঃ ২ সিসি করে ওষুধ প্রত্যহ মাংসে ইনজেকশন দিতে হবে।

 

২। পেটের পানি বা শোথ কমানো বা মুত্র বৃদ্ধির জন্য Spironolactone যুক্ত ওষুধ দিতে হবে। যেমন,

Tab Pilactone 25mg or,

Tab Polactone 25mg or,

Tab Spiron 25mg or,

Tab Spirul 25mg or,



Tab Verospiron 25mg.

উপরের ওষুধ ব্যর্থ হলে উপরের ওষুধের সাথে অথবা এককভাবে নিম্নোক্ত Frusemide যুক্ত ওষুধ দিতে হবে। যেমন,

Tab Frusin 40mg or,

Tab Furalax 40mg or,

Tab Lasix 40mg or,

Tab Fusid 40mg.

মাত্রাঃ প্রত্যহ নাস্তার পূর্বে ১টি বড়ি।

 

অথবা, Hydrocloro Thiazide + Amiloride যুক্ত ওষুধঃ

Tab Amizide or,

Tab Dirumide or,

Tab Kaltide or,

Tab Naturetic.

মাত্রাঃ প্রত্যহ সকালে নাস্তার পূর্বে ১টি বড়ি সেব্য।

 

অথবা, Hydrochloro Thiazide + Triamterine যুক্ত ওষুধঃ

Tab Dezide or,

Tab Dirutens.

মাত্রাঃ প্রত্যহ ½ বা ১ দিন পর পর খাবার পর পর ১ বার সেব্য।

 

অথবা, Frusemide + Spironolactone যুক্ত ওষুধঃ

Tab Spiromide or,

Tab Frulac.

মাত্রাঃ ১টি করে বড়ি দিনে ½ বার।

 



অথবা, Potassium Chloride যুক্ত ওষুধঃ

Sy Electro-K or,

Sy K+chlor or,

Sy K+T or,

Sy Seema-K or,

Sy K-20 or.

মাত্রাঃ ২ চামচ করে দিনে ২/৩ বার।

 

অথবা, Inj Glucose solution 10ml or Dextrose Saline IV.

মাত্রাঃ দিনে ২ বার I.V দিলে লিভারের উপকার আসে।

 

অথবা, পায়খানা পরিষ্কার রাখার জন্যঃ

Tab Laxenna or,

Tab Senalax.

মাত্রাঃ রাত্রে ঘুমানোর সময় পূর্ণ বয়স্ক ২টি বড়ি সেব্য।

 

অন্যদিকে, Glycerine Suppositony মলদ্বারে দিতে হবে।

এছাড়াও, Magnesium Hydroxide, Amoxycillin, B-Complex, Ascorobic Acid, High Potency Multivitamin+Multimineral and Antioxidant Vitamin যুক্ত ওষুধ ব্যবহার করা হয়।

 

আনুষঙ্গিক চিকিৎসাঃ

১। প্রচুর পরিমাণে প্রোটিনযুক্ত খাবার দিতে হবে।

২। পরিশ্রম কমিয়ে বিশ্রাম নিতে হবে বেশি বেশি।

৩। পায়খানা পরিষ্কার রাখতে হবে।

৪। বমি থাকলে বমি বন্ধের ওষুধ দিতে হবে।



৫। প্রচুর ভিটামিন যুক্ত ওষুধ খেতে হবে।

৬। রোগ জটিল মনে করলে প্রথমে অভিজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া ভালো।


আজ এখানেই শেষ করছি। ফিরে আসবো অন্য দিন নতুন কোনো স্বাস্থ্য টিপস নিয়ে। সবাই সুস্থ্য, সুন্দর ও ভালো থাকুন। নিজের প্রতি যত্নবান হউন এবং সাবধানে থাকুন। করোনাকে ভয় নয় – সাবধানতা ও সচেতনতাই যথেষ্ট।

এই পোস্টটি যদি আপনার ভালো লাগে এবং প্রয়োজনীয় মনে হয় তবে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না যেন।

 

[বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যগুলো কেবল স্বাস্থ্য সেবা সম্বন্ধে জ্ঞান আহরণের জন্য। অনুগ্রহ করে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ সেবন করুন। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবনে আপনার শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি হতে পারে। প্রয়োজনে, আমাদের সহযোগিতা নিন। আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ।]

অ্যাডমিনঃ

আপনাদের সাথে রয়েছি আমি মোঃ আজগর আলী। ছোট বেলা থেকেই কম্পিউটারের প্রতি খুব আগ্রহ ছিল। মানুষের সেবা করারও খুব ইচ্ছে। আর তাই গড়ে তুলেছি স্বাস্থ্য সেবা বিষয়ক ওয়েবসাইট সানরাইজ৭১। আশা করছি, আপনারা নিয়মিত এই ওয়েবসাইট ভিজিট করবেন এবং ই-স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণ করবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     আরও পড়ুন:

সাম্প্রতিক পোস্টসমুহ

আজকের দিন-তারিখ

  • মঙ্গলবার (রাত ১২:৫৫)
  • ২৪শে নভেম্বর ২০২০ খ্রিস্টাব্দ
  • ৮ই রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরি
  • ৯ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ (হেমন্তকাল)