আজ বুধবার,২৯শে বৈশাখ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ,১২ই মে ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

Sample Image of Indigestion

বদহজম বা অজীর্ণতা কেন হয়, লক্ষণসমুহ কি কি এবং চিকিৎসা কি

অজীর্ণ (বদ হজম)


সানরাইজ৭১ এ সবাইকে স্বাগতম। আশা করছি, সবাই ভালো আছেন। আজ আমরা আলোচনা করবো অজীর্ণ
বা বদ হজম নিয়ে। আলোচনাটি একটু দীর্ঘ হবে। আশা করি, সময় নিয়ে পড়বেন। তো আর কথা নয় – সরাসরি যাচ্ছি মূল আলোচনায়।

রোগ বিবরন : অনিয়মিত বা অতিরিক্ত ভোজন তৈলাক্ত চর্বিযুক্ত আহারাদি ভক্ষন, রাত্রি জাগরন, অতিরিক্ত চা কফি মদ্য পান, ধুমপান, গুরুপাক দ্রবাদি ভোজন ইত্যাদি কারন বশতঃ খাদ্য ভাল রূপে পরিপাক না হইয়া অজীর্ণ রোগ জন্মায়। ক্ষুধা লোপ কিংবা রাক্ষুসে ক্ষুধা গরম মসলা যুক্ত দ্রব্যাদি আহারের ইচ্ছা, বুক গলা জ্বালা, অম্ল উদগার, আহারান্তে পেট বেদনা, বুক ধড়ফড় করা ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দেয।

চিকিৎসাঃ
নাক্স ভমিকা (Nux Vomica): হিংসুটে স্বভাব ভীষন রাগী, কলহ প্রিয়, শীত কাতর, মদ্যপায়ী, নেশাখোর, অতিরিক্ত রাত্রি জাগরণ, অধিক মসলাযুক্ত খাদ্য, গুরুপাক দ্রব্যাদি ভোজন বা অধিক ভোজন জনিত অজীর্ণতা। খাদ্য দ্রব্য ভাল রূপে পরিপাক না হইয়া আহারের দুই এক ঘন্টা পরে পেট ব্যথা এবং মুখে টক জল উঠে সহ ইত্যাদি লক্ষণে ইহা উপকারী।

সেবন বিধি : শক্তি 3x বা 6 তিন চার ফোঁটা সামান্য জলসহ দিনে তিন চার বার সেব্য। পুরাতন রোগে 200 বা 1m দুই চার মাত্রা সেব্য।

কার্বোভেজ (Carbo Veg) : কোন প্রকার কঠিন অসুখে রোগী পাখার বাতাস চায়। মুক্ত হাওয়ার জন্য আকাঙ্খা করে। অন্ধকারে ভুতের ভয়, স্মৃতি শক্তি হ্রাস, শীত কাতর। এই ঋতুর রোগীদের কার্বোভেজ একটি মহৎ উপকারী ঔষধ। খাদ্য দ্রব্য ভালরূপে পরিপাক না হইয়া পেট ফাঁপে। বিশেষ করে নীচের পেট দুর্গন্ধ, বাত-কর্ম বা ঢেকুর উঠিলে আরামবোধ ইত্যাদি লক্ষণে 30 বা 200 শক্তি 3 ঘন্টা অন্তর কয়েক মাত্রা সেবন করিলে উক্ত রোগ আরোগ্য হয়। নাক্স প্রয়োগের পর অজীর্ণ পীড়া সম্পূর্ণ আরোগ্য না হইলে কার্বোভেজ 200 বা 1m ২/৩ বার সেব্য।

লাইকোপোডিয়াম (Lycopodium) : রোগী অতিশয় কৃপন, ভীরু, একা থাকিতে ভয়, মেজাজ রাগী, নতুন লোকের আগমনে ভয়, মনের আনন্দে ক্রন্দন, গরম খাবার পছন্দ, গরমে কাতর, অজীর্ণ পীড়ায় বেশ ক্ষুধা হয়। সামান্য আহারে মনে হয় পেট ভরিয়া গিয়াছে। কোষ্ঠবদ্ধতা সহ মাঝে মাঝে তরল মলের সঙ্গে কঠিন (শক্ত) মল দেখা যায়। পেট ফাঁপে, টক ঢেকুর উঠে, ভুট-ভাট করে পেট ডাকে। বিকাল ৪ টা থেকে রাত ৮ টার মধ্যে রোগের বৃদ্ধি সহ ইত্যাদি লক্ষণে 3 বা 6 শক্তি দিনে তিন মাত্রা 30 বা 200 শক্তি দিনে দুই মাত্রা পুরাতন রোগে 1m বা 10m বা আরো উচ্চ শক্তি ব্যবহার্য।

নেট্রাম কার্ব (Natrum Carb) : গোলমাল পছন্দ করে না, গান বাজনা নিতান্ত অপছন্দনীয়। শীত কাতর, দুধ খাইলে অজীর্ণ বা উদরাময় দেখা দেয়, সর্বদা পেট ভার বোধ মনে হয়, বায়ূ সঞ্চয় হইয়া পেট ফুলিয়া উঠে। কখনো কোষ্ঠবদ্ধতা কখনো টক গন্ধযুক্ত তরল মল বের হয় এবং শাক সবজি পানাহারে রোগ বৃদ্ধি পায়।

সেবন বিধি : শক্তি 6 বা 30 দিনে ৩ মাত্রা। পুরাতন রোগে 200 বা 1m সকাল বিকাল দুই মাত্রা।

ইপিকাক (Ipecac) : ঘূত পক্ক পোলাও, মাংস, অধিক মিষ্টি বা মিষ্টান্ন, গুরুপাক দ্রব্যাদি আহার করিয়া পেট বেদনা, পাতলা পায়খানা, বমি ও বমি-বমি ভাব হইলে ইপিকাক খুবই উপকারী।

সেবন বিধি : শক্তি 3x  মাত্র ৩ থেকে ৪ ফোঁটা সামান্য জলের সঙ্গে দুই ঘন্টা অন্তর সেব্য।

পালসেটিলা (Pulsatilla) : শান্ত স্বভাব, কোমল মন, অভিমানী, অল্প কথায় মনে ব্যথা, গরম কাতর, মুক্ত বাতাস পছন্দ করে। এই ধাতু রোগীদের জন্য পালসেটিলা অধিক উপকারী। চর্বি যুক্ত মাংস, ঘৃত পক্ক পোলাও এবং অধিক মিষ্টি বা মিষ্টান্ন ভোজন জনিত অজীর্ন বা উদরামর পেট বেদনায় পালসেটিলা অমোঘ।

সেবন বিধি : শক্তি 3x চার ফোঁটা সামান্য ঠান্ডা জলের সাথে ২ ঘন্টা অন্তর সেব্য।

ম্যাগনেসিয়া কার্ব (Magnesia Carb) : খিটখিটে স্বভাব, বদ মেজাজী, শীত কাতর, মাংস খাবার অত্যন্ত পছন্দনীয়। এই ধাতুর রোগীতে ইহা অধিক কার্যকরী। দুগ্ধ পান অসহ্য, পেট ফাঁপে, বুক জ্বলে, টক ঢেকুর উঠে, মুখে টক আস্বাদ, রুটি, আলু এবং দুধ খাইলে পেটে বায়ু জমে, শূল ব্যথা হয় সহ প্রভৃতি লক্ষণে ইহা উপকারী ।

সেবন বিধি : শক্তি 30 বা 200 দিনে 2 বার সেব্য।

চায়না (China) : সমস্ত পেট ফাঁপা, পাতলা পায়খানার সাথে অজীর্ণ খাদ্য নির্গত হয় । ফল খাইলে পেটের অসুখ বাড়ে। অনেক সময় ফল খাইয়া অজীর্ণ বা উদরাময় দেখা দেয়। রোগী দিন দিন দুর্বল হইতে থাকে। খাদ্য দ্রব্য হজম না হইয়া আস্ত বা অর্ধ ভাঙ্গা নির্গত হয়। ইহাতে চায়না অব্যর্থ।

সেবন বিধি : শক্তি 3x বা 6 মাত্র ৩/৪ ফোঁটা সামান্য জলের সহিত ৩ ঘন্টা অন্তর সেব্য। অন্যদিকে, 30 বা 200 শক্তিও উপকারী।

ক্যারিকা পেঁপেয়া (Carreca Papaya) : যাহাদের হজম শক্তি দুর্বল, মাংস, ডিম, গুরুপাক দ্রব্যাদি এমন কি সামান্য দুধও হজম করিতে পারে না। অল্প অল্প করিয়া দিনে রাত্রে কয়েকবার পায়খানায় যায়। অজীর্ণ তরল মল। চক্ষু হলদে, জিহ্বায় হলদে ময়লা, রক্ত স্বল্পতা, দুর্বল, পেট ফোলা, দুগ্ধ খাইলে অজীর্ণ বা উদরাময় দেখা দেয়।

সেবন বিধি : শক্তি Q (মাদার টিংচার) ৮/১০ ফোটা সামান্য জলসহ আহারের পর শিশুদের অর্ধ মাত্রা। শক্তি 3x ব্যবহারেও উপকার পাইয়াছি।

সালফার (Sulphur) : খিট খিটে স্বভাব, অল্পতে উত্তেজিত হইয়া উঠে। অত্যন্ত স্বার্থপর, গরমে কাতর, অপরিস্কার অপরিচ্ছন্ন রোগী যাহারা প্রায়ই নানাবিধ চর্ম পীড়ায় ভোগে। পায়ের তলায় জ্বালা, শরীরে দুর্গন্ধ ঘাম। রুটি, আলু, ঘৃত প্রভৃতি দ্রব্য আহার করিলেই পেট ফাঁপে, টক ঢেকুর উঠে। গন্ধকের বর্ণ পায়খানা বাত-কর্মে ভীষন দুর্গন্ধ। এই প্রকৃতির রোগীদের নতুন বা পুরাতন অজীর্ণ পীড়ায় ইহা অব্যর্থ।

সেবন বিধি : শক্তি 30 বা 200 দিনে 2 বার সেব্য। পুরাতন রোগে 1m বা 10m 2 বার সেব্য।

বাইওকেমিক চিকিৎসাঃ
নেট্রাম ফস (Natrum Phos) : টক ঢেকুর উঠে, বুক জ্বলে, মুখে টক জল উঠে। হরিদ্রা বর্ণের জিহ্বা আহারের পর পেট বেদনা হয়। অম্ল গন্ধযুক্ত বাহ্যে মাঝে মাঝে অম্ল বমন ইত্যাদি লক্ষণে ইহা উপকারী। লক্ষন অনুযায়ী হোমিওপ্যাথিক ঔষুধের সঙ্গে বাইওকেমিক ঔষধ পর্যায়ক্রমে সেবনে আরো অধিক উপকার হয়।

সেবন বিধি : শক্তি 6x বা 12x মাত্র ১ থেকে ৪ বড়ি একমাত্রা (বয়স অনুসারে) প্রত্যহ ৩ বার সেব্য।

নেট্রাম মিউর (Natrum Mur) : অত্যাধিক লবন প্রিয়, তিক্ত ঝাল খাইবার প্রবল ইচ্ছা। রুটি খাইতে অনিচ্ছা, রুটি খাইলে অজীর্ন পীড়া দেখা দেয়। মুখে জল উঠে, মাথা ধরে, অতিশয় জল পিপাসা ইত্যাদি লক্ষণে ইহা মহৎ কার্যকরী ওষুধ।

সেবন বিধি : শক্তি 6x বা 12x মাত্র ২ থেকে ৪ বড়ি একমাত্রা (বয়স অনুসারে) প্রত্যহ ৩ বার সেব্য।

ক্যালকেরিয়া ফস (Calearea Phos) : রক্তহীন দূর্বল, জীর্ণ-শীর্ণ রোগীদের হজম শক্তির দুর্বলতা, আহারে অনিচ্ছা, উদরে বায়ু জমে সহ ইত্যাদি লক্ষণে বা অন্য ঔষধের সহিত পর্যায়ক্রমে ইহা সেবনে অজীর্ণ পীড়া আরোগ্য হয়।

সেবন বিধি : শক্তি 3x বা 6x মাত্র ২ থেকে ৪ বড়ি একমাত্রা (বয়স অনুপাতে ) ৩ঘন্টা অন্তর সেব্য।

ক্যালি মিউর (Kali Mur) : ঘৃত পক্ক বা অধিক তৈলাক্ত খাদ্য দ্রব্য আহার জনিত অজীর্ণ পীড়া, তৈলাক্ত উদগার উঠে যাদের এবং জিহ্বা সাদা বর্ণের প্রলেপ যুক্ত রোগীদের ইহা অধিক উপযোগী।

সেবন বিধি : শক্তি 6x মাত্র ২ থেকে ৪টি বড়ি একমাত্রা (বয়স অনুপাতে) ৩ ঘন্টা অন্তর সেব্য।

পথ্য ও আনুষাঙ্গিক ব্যবস্থাঃ

নিয়মিত আহার করা বিধেয়। ভালভাবে চর্বন করিয়া আহার করা উচিত। সকাল সন্ধ্যায় সাধ্যমত ব্যায়াম করা ভাল। পুরাতন সরু চাউলের অন্ন, শিং বা মাগুর মাছের ঝোল, কাঁচা কলা, কাঁচা পেঁপে সুপথ্য হিসেবে গণ্য। গুরুপাক দ্রব্যাদি ভোজন নিষিদ্ধ।

আজকের আলোচনা এখানেই শেষ করলাম। আশা করি, আলোচনাটি আপনাদের ভালো লেগেছে। আবারও আসবো নতুন কোনো বিষয় নিয়ে অন্যদিন। সেই পর্যন্ত সবাই সুস্থ্য, সুন্দর ও ভালো থাকুন। নিজের প্রতি যত্নবান হউন সাবধানে থাকুন। করোনাকে ভয় নয় – সচেতন থাকুন।

 

[বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যগুলো কেবল স্বাস্থ্য সেবা সম্বন্ধে জ্ঞান আহরণের জন্য। অনুগ্রহ করে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ সেবন করুন। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবনে আপনার শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি হতে পারে। প্রয়োজনে, আমাদের সহযোগিতা নিন। আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ।]

অ্যাডমিনঃ

আপনাদের সাথে রয়েছি আমি মোঃ আজগর আলী। ছোট বেলা থেকেই কম্পিউটারের প্রতি খুব আগ্রহ ছিল। মানুষের সেবা করারও খুব ইচ্ছে। আর তাই গড়ে তুলেছি স্বাস্থ্য সেবা বিষয়ক ওয়েবসাইট সানরাইজ৭১। আশা করছি, আপনারা নিয়মিত এই ওয়েবসাইট ভিজিট করবেন এবং ই-স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণ করবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     আরও পড়ুন:

Subscribe: Dinajpur School

সাম্প্রতিক পোস্টসমুহ

আজকের দিন-তারিখ

  • বুধবার (রাত ৯:০২)
  • ১২ই মে ২০২১ খ্রিস্টাব্দ
  • ২৯শে রমজান ১৪৪২ হিজরি
  • ২৯শে বৈশাখ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ (গ্রীষ্মকাল)