আজ মঙ্গলবার,৯ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ,২৪শে নভেম্বর ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

www.sunrise71.com

শিশুদের রোগ ও হোমিওপ্যাথিতে এর চিকিৎসা – পর্বঃ ০২

শিশুর রোগ ও চিকিৎসা


শিশুর কোনো রোগ হলে রোগটা কি তা আগে জানা দরকার। শিশুর মা ও যিনি চিকিৎসা করবেন উভয়কেই এ ব্যাপারে অনুসন্ধান করে মূল রোগটাকে ধরবার চেষ্টা করতে হবে।

শিশু কথা বলতে পারে না, আকার-ঈঙ্গিতে বোঝাতেও পারে না কিছু – এ অবস্থায় নিজেদেরই লক্ষণ দেখে রোগ নির্ণয় ও ওষুধ নির্বাচন করতে হবে।

আবার এমন রোগও আছে যার কোনো লক্ষণ বাইরে থেকে বোঝা যায় না। যেমন- পেট কামড়ানি, পেট ব্যথা প্রভৃতি। এক্ষেত্রে শিশু কেবল কাঁদে।



মা ও চিকিৎসককে কান্নার কারণ কি তা জানতে হবে। অভিজ্ঞ চিকিৎসক এ রকম অবস্থায় শিশুর মায়ের ঐ সময়কার শারিরীক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করবেন।

মা ও শিশু উভয়কে পর্যবেক্ষণ করে চিকিৎসক একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন যে, রোগটা এই হতে পারে বা হওয়া সম্ভব। এবার তিনি ওষুধ নির্বাচন করবেন।

এ কথা মনে রাখা দরকার যে, শিশু রোগের চিকিৎসা করা কাজটা মোটেই সহজ নয়। খুব সাবধানতা অবলম্বনপূর্বক এ কাজে হাত দেওয়া উচিত।

ওষুধের মাত্রার বিষয়েও হুঁশিয়ার থাকতে হয় চিকিৎসককে। মাত্রা বেশি হলে শিশুর পক্ষে যথেষ্ট ক্ষতির আশংকা থাকে।


 

কোষ্ঠকাঠিন্যঃ বড়দের মতো শিশুদেরও কোষ্ঠকাঠিন্য হয়। যকৃতের দোষ, অজীর্ণতা প্রভৃতি কারণে শিশুর এ রোগ দেখা দেয়।

পায়খানা কিছুতেই হতে চায় না, অনেক কষ্টে সামান্য একটু ন্যাড় পায়খানা হয়, পায়খানা খুবই শক্ত। মায়ের কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে সাধারণত শিশুরও এরকম হয়ে থাকে। তাই মায়ের খাদ্য লঘু হওয়া দরকার।

পায়খানা খুব শক্ত হলে- লাইকোপোডিয়াম ৩০।

পাকাশয়-যন্ত্রের গোলযোগের জন্য কোষ্ঠকাঠিন্য হলে- অ্যান্টিম ক্রুড ৬।



শক্ত ন্যাড় পায়খানা হলে- নাক্সভম ৩০।

ক্ষতের জন্য এ রকম হলে- সালফার ৩০।

শিশুদের কোষ্ঠকাঠিন্যের শ্রেষ্ঠ ওষুধ- ব্রায়োনিয়া ৩।

 

শিশুর কৃমিঃ কৃমি হলে শিশু খুব কষ্ট পায়। গুঁড়ো বা কুঁচো কৃমি হলে সেগুলি অনেক সময় মলদ্বার দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। সে সময় খুব কুট-কুট করে বলে শিশুরা অস্থিরতা প্রকাশ করে।

কৃমি হয়েছে বুঝলেই- সিনা ৩x-২০০।

পিকচারি দ্বারা মলদ্বার দিয়ে ‍নুন পানি প্রবেশ করালেও কৃমি নষ্ট হয়।


পেট ব্যথাঃ শিশুর পেট ব্যথা করলে অস্থির হয়, কাঁদে, হাত-পা ছোঁড়ে। পেট কামড়ালে শিশু এতো কাঁদে যে কাউকে স্থির থাকতে দেয় না। ঠান্ডা লাগা, মায়ের খাওয়ার দোষ, শিশু কৃমি, শিশুর কোষ্ঠকাঠিন্য বা অজীর্ণতা দোষেই পেট ব্যথা করে। অনেক সময় শিশুর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়, পায়খানা হয় সবুজ রঙের পাতলা। সঠিক কারণ বুঝে পেট ব্যথার ওষুধ দেওয়া উচিত।

মায়ের খাওয়ার দোষে শিশুর পেট ব্যথা করলে- পালসেটিলা ৬।

পায়খানা না হওয়ার জন্য পেট ব্যথা করলে- নাক্সভম ৩০।

সবুজ রঙের মল, হাত-পা ঠান্ডা, কৃমির জন্য পেট ব্যথা, মায়ের খাওয়ার দোষে বা শিশুর খাওয়ার দোষে পেট ব্যথা করলে- ক্যামোমিলা ১২।

যদি কৃমির জন্য পেট ব্যথা করে তাহলে দিতে হবে- সিনা ৩x-২০০। এ অবস্থায় শিশুকে ঈষদুষ্ণ পানি খাওয়ালে একটু আরাম বোধ করে। শিশুর মা’কেও গরম পানি খাওয়ানো ভালো।


শিশুর মাথায় ‍উকুনঃ উকুন এক ধরনের ছোট্ট পোকা। চুলের গোড়ায় এরা বাসা বাঁধে। চুলের গোড়ায় ময়লা জমলে এদের বাসা বাঁধতে সুবিধা হয়। সুতরাং চুল ও চুলের গোড়া সর্বাগ্রে পরিষ্কার রাখা দরকার। এতেও যদি উকুন না ধ্বংস না হয় তাহলে ওষুধ খাওয়াতে হবে।

এর ওষুধ- নেট্রাম মিউর ১২x বিচূর্ণ।

 

হুপিং কাশিঃ এটি শিশুদের একটি কষ্টদায়ক রোগ। কাশবার সময় হুপ করে একটা শব্দ হয়। কাশতে কাশতে অনেক সময় দম আটকে যাবার মতো অবস্থা হয়। কাশি সহজে থামতে চায় না। এ রোগ হলে শিশুকে ৬ মাস পর্যন্ত ভোগায়। কাশতে কাশতে শিশুর চোখ-মুখ লাল হয়ে ওঠে, জিভ ও গলা শুকিয়ে যায়।

এ রোগের পক্ষে একটি ভালো ওষুধ- মিফাইটিস ৩x। দু’ঘন্টা অন্তর সেব্য।

কষ্টদায়ক কাশিতে- ড্রসেরা ৩x।

খিঁচুনি যদি বেশি হয় তাহলে দিতে হবে- কিউপ্রাম ৬।

যদি ওষুধটি ব্যর্থ হয় তাহলে দেওয়া দরকার- ভিরেট্রাম ৬।



দম আটকে যাবার মতো কাশিতে- ইপিকাক ৩।

 

প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়াঃ শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর অনেক সময় প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যায়। যদি দেখা যায় ২৫/৩০ ঘ্ন্টা সময়ের মধ্যে প্রস্রাব হয়নি তাহলে সেই মুহুর্তে প্রস্রাব করানোর ব্যবস্থা করতে হবে।

এ অবস্থায় ওষুধ- অ্যাকোনাইট ৩। এতে কাজ না হলে- ওপিয়াম বা ক্যান্থারিস ৬।

প্রস্রাব হতে হতেই হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে খাওয়াতে হবে- মারকিউরিয়াস কর ৬।

 

শিশুর মৃগী রোগঃ শিশুর মৃগী রোগ হলে তাকে খাওয়াতে হবে- ক্যালক্যারিয়া কার্ব ৩০। মৃগী রোগ যদি পুরাতন হয় তাহলে দিতে হবে- সালফার ৩০।

 

মস্তিষ্কে পানি সঞ্চয়ঃ শিশুর মস্তিষ্কে পানি সঞ্চয় হলে নানা রকম অসুবিধা ভোগ করতে হয় শিশুকে। মূত্ররোধ, বালিশে মাথা ঘষা, প্রস্রাবের পরিমাণ কম হওয়া, বিকট চিৎকার প্রভৃতি অসুবিধা ভোগ করতে হয়।

বাহ্যিক লক্ষণের মধ্যে প্রধান হলো- চেহারা বুড়োদের মতো হয়ে যায়, মাথাটা বড় হয়ে পড়ে, শরীর রোগা হয়, শিশু দূর্বল হয়ে পড়ে প্রভৃতি।

রোগ লক্ষণের সঙ্গে ওষুধের চরিত্রগত লক্ষণ মিলিয়ে ওষুধ খাওয়াতে পারলে রোগ সেরে যায় এবং শিশু স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে পায়।



প্রস্রাবের পরিমাণ কম হলে, বিকট চিৎকার করে ঘুম ভাঙলে, বালিশে মাথা ঘষলে- এপিস মেল ৩।

প্রস্রাব বন্ধ হলে- হেল্লিবোরাস ৩।

এ রোগের প্রধান প্রধান লক্ষণে- ক্যালক্যারিয়া কার্ব ৩০, সিলিকা ৩০ বা সালফার ৩০ ব্যবহার করা হয় সাধারনত। রোগ পুরনো হলে- অ্যাপোসাইনাম Q।

 

দুর্গন্ধযুক্ত প্রস্রাবঃ শিশুদের প্রস্রাবে নানারকম গন্ধ হতে পারে। এটা মোটেই ভালো নয়।

আঁশটে গন্ধযুক্ত প্রস্রাব হলে- ইউর‌্যান নাইট্রিক ৩।

মিষ্ট গন্ধযুক্ত প্রস্রাব হলে- বেঞ্জয়িক এসিড ৬।

ঝাঁঝালো গন্ধযুক্ত প্রস্রাব হলে- নাইট্রিক অ্যাসিড ৩০।

অত্যাধিক দুর্গন্ধযুক্ত প্রস্রাব হলে- বেঞ্জয়িক অ্যাসিড ৩x।

টক গন্ধযুক্ত প্রস্রাব হলে- গ্রাফাইটিস ৬।


বিছানায় প্রস্রাবঃ অনেক শিশুই বিছানায় প্রস্রাব করে। প্রস্রাব করিয়ে শোয়ালেও প্রস্রাব করে ফেলে।

রাত্রিতে ঘুমাবার কিছুক্ষণ পরেই বিছানায় প্রস্রাব করলে- কষ্টিকম ৬।

ঘুমাবার সময় অসাড়ে প্রস্রাব করলে- বেলেডোনা ৬।

স্নায়বিক দুর্বলতার জন্য প্রস্রাব করলে- ক্যাল ফস ৬।

দিবাভাগে বিছানায় প্রস্রাব করলে- ফেরাম ফস ৬।

কৃমির জন্য বিছানায় প্রস্রাব করলে- সিনা ২x-২০০।

 

পুঁয়ে যাওয়াঃ বহু শিশুর এ রোগটা হতে দেখা যায়। রোগা হয়ে যায়, খুঁত-খুঁত করে, খাবারে অরুচি, বদহজম, মুখ দিয়ে দুধ তোলে, স্তন মুখে দিলে টানতে চায় না প্রভৃতি এ রোগের লক্ষণ।

আবার, অনেক সময় শিশুর খিদে থাকে, খায় অথচ রোগা হয়ে যায় এমন লক্ষণও দেখা যায়।

খায় অথচ শিশু রোগা হয় এমন লক্ষণে- অ্যাব্রোটেনাম ৩০।

খিদে থাকে অথচ খায় না ও রোগা হয়ে যায় এমন লক্ষণে- আয়োডিন ৬।

এ রোগের প্রধান ওষুধ- সালফার ৩০ (প্রথমে), ক্যাল-কার্ব ৩০ (পরে)।

 

যকৃত বড় ও কঠিনঃ শিশুর যকৃত বড় ও কঠিন হলে নানা রকম লক্ষণ দেখা দেয়, যেমন- রক্তের রঙ কালো বা সাদা হয়, পেটটা বড় হয়, চোখ হলদে হয় ও রক্তশুন্য হয়, কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয়, শিশুর শোথ হতে পারে, রোগা হয়ে যায় প্রভৃতি।

এরকম হল উদরাময়ও দেখা দিতে পারে।



যকৃত বড় হলে- ক্যালক্যারিয়া কার্ব ৩০।

যকৃত শক্ত হলে- মার্ক আয়োড ৩।

চোখ হলদে বা রক্তশুন্য হলে- মার্ক সল ৬।

শিশু ক্রমশঃ রোগা হতে থাকলে- আর্জ নাই ৩।

উদরাময় দেখা দিলে- পডোফাইলাম ৬।

কোষ্ঠকাঠিন্য হলে- সালফার ৩০।

শোথ দেখা দিলে- এপিস ৩।

যকৃতের ওপর কচি বাছুরের চোনা গরম করে প্রলেপ দিলে উপকার হয় (আনুষঙ্গিক চিকিৎসা হিসাবে ধরে নিতে পারেন)। শিশু ও শিশুর মায়ের চুন বা চুন মিশ্রিত কোনো কিছু খাওয়া উচিত নয়।

এ অবস্থায় শিশুকে দুধ না খাওয়ানোই ভালো। পানি-বার্লি আহার হিসেবে ব্যবস্থা করলে ভালো হয়।

 

শিশুর চুলকানিঃ শিশুর হাত-পা অথবা সর্বাঙ্গে চুলকালে শিশু অস্থির হয়, হাত-পা ছোঁড়ে, কাঁদে, কিছু খেতে চায় না। গায়ের কাপড় খুললে চুলকানি আরও বাড়ে।

এ রোগের প্রধান ওষুধ- সালফার ৩০-২০০।

সারা শরীর চুলকালে- অ্যালুমিনা ৩x।

মলদ্বার চুলকালে- কলিনসোনিয়া ৩x।

চুলকানির পর জ্বালা করতে থাকলে- রাসটক্স ৩।



চুলকাতে চুলকাতে রক্ত পড়লে- মারকিউরিয়াস ৬।

যদি গায়ের কাপড় খুললে চুলকানি বাড়ে তাহলে খাওয়াতে হবে- আর্সেনিক ৬।


আজকের আলোচনা এখানেই শেষ করলাম। আশা করি, বুঝতে পেরেছেন। নতুন কোনো স্বাস্থ্য টিপস নিয়ে হাজির হবো অন্য দিন। সবাই সুস্থ্য, ‍সুন্দর ও ভালো থাকুন। নিজের প্রতি যত্নবান হউন এবং সাবধানে থাকুন।

এই পোস্টটি যদি আপনার ভালো লাগে এবং প্রয়োজনীয় মনে হয় তবে অনুগ্রহ করে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না যেন।

 

[বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যগুলো কেবল স্বাস্থ্য সেবা সম্বন্ধে জ্ঞান আহরণের জন্য। অনুগ্রহ করে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ সেবন করুন। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবনে আপনার শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি হতে পারে। প্রয়োজনে, আমাদের সহযোগিতা নিন। আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ।]

অ্যাডমিনঃ

আপনাদের সাথে রয়েছি আমি মোঃ আজগর আলী। ছোট বেলা থেকেই কম্পিউটারের প্রতি খুব আগ্রহ ছিল। মানুষের সেবা করারও খুব ইচ্ছে। আর তাই গড়ে তুলেছি স্বাস্থ্য সেবা বিষয়ক ওয়েবসাইট সানরাইজ৭১। আশা করছি, আপনারা নিয়মিত এই ওয়েবসাইট ভিজিট করবেন এবং ই-স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণ করবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     আরও পড়ুন:

সাম্প্রতিক পোস্টসমুহ

আজকের দিন-তারিখ

  • মঙ্গলবার (রাত ১:৪৫)
  • ২৪শে নভেম্বর ২০২০ খ্রিস্টাব্দ
  • ৮ই রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরি
  • ৯ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ (হেমন্তকাল)