আজ রবিবার,৭ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ,২২শে নভেম্বর ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

www.sunrise71.com

গর্ভকাল , প্রসবকাল ও প্রসবের পরবর্তী কয়েকটি রোগের চিকিৎসা পর্ব – ০৩

গর্ভকাল, প্রসবকাল ও প্রসবের পরবর্তী কয়েকটি রোগের চিকিৎসা


 

সানরাইজ৭১ এ আপনাদের স্বাগতম। আজ আমরা আলোচনা করবো গর্ভকাল, প্রসবকাল ও প্রসবের পরবর্তী কয়েকটি রোগের লক্ষণ ও সেগুলোর চিকিৎসা নিয়ে।

আর্টিকেলটি অনেক বড় হওয়ায় এটাকে তিনভাগে ভাগ করে নিয়েছি। তন্মধ্যে এটি হলো তৃতীয় পর্ব। একটু সময় নিয়ে পুরো আর্টিকেলটি পড়লে অনেক কিছুরই অভিজ্ঞতা পাবেন। তো চলুন শুরু করি।


 

গর্ভপাতের পরবর্তী অবস্থাঃ গর্ভপাতের পর বিপদ কেটে গেল, এমনটা ভাবা ভুল। বরং বিপদের আশংকা বেশি দেখা দিল বলা যায়। প্রসূতিকে এ অবস্থায় পর্যবেক্ষণ করা দরকার। দেখা দরকার – তার ফুল পড়েছে কিনা, রক্ত বেশিদিন ধরে পড়ছে কিনা ইত্যাদি।

ফুল পড়তে দেরি হলে- পালসেটিলা ৩০ বা সিকেলি ৩০।

বেশিদিন ধরে (কয়েক সপ্তাহ) রক্ত পড়তে থাকলে- চায়না ৬।

প্রসূতিকে এরকম অবস্থায় বেশ কিছুদিন বিশ্রামে রাখা দরকার।

 

প্রসবকালঃ আগেই বলা হয়েছে গর্ভসঞ্চার ও প্রসবকালের মধ্যবর্তী সময় মোট ২৮০ দিন। যদি স্বাভাবিকভাবে প্রসব হয় অর্থাৎ কোনোরকম বিপত্তি দেখা না দেয় তাহলে প্রসবের ১০ দিন আগে তলপেট ঝুলতে ‍শুরু করবে ও কোমড় সরু হতে থাকবে।

কাঁকালের নিচে বেদনা দেখা দেবে। বার-বার প্রস্রাবের বেগ হবে। জরায়ুর আকার সামান্য বদলে যাবে। জননেন্দ্রিয় পেশিগুলো আলগা হয়ে পড়বে। বাইরের জননেন্দ্রিয় ভিজে-ভিজে মনে হবে। এ সময় বমি হতে পারে বা বমি-বমি ভাব থাকতে পারে। সামান্য কাঁপুনি দেখা দেবে। যোনিদ্বার থেকে একটু-আধটু রস-রক্ত বের হতে থাকবে।

উপরের লক্ষণগুলো দৃষ্ট হলে বুঝতে হবে প্রসবকাল আসন্ন অর্থাৎ প্রসবের আর বেশি দেরী নেই। এ অবস্থায় গর্ভিনীকে চিৎ করে শুইয়ে তার পেটের উপর সামান্য নারকেল তেলের সঙ্গে পানি মিশিয়ে আলতোভাবে মালিশ করা দরকার। জননেন্দ্রিয়ের চারপাশে লাগিয়ে দিতে হবে ভেসলিন বা নারকেল তেল।

প্রসব বেদনা শুরু হবার পর ৫/৬ ঘন্টার মধ্যে সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়। কিন্তু তা যদি না হয় তাহলে চিকিৎসা করানো দরকার। কি কারণে প্রসবে দেরী হচ্ছে তা অনুসন্ধান করে জানতে হবে এবং গর্ভিনীকে সেই লক্ষণ বুঝে ওষুধ খাওয়াতে হবে।

মৃদু বেদনা ও বমি-বমি ভাব থাকলে- পালসেটিলা ৩০।

বেদনা যদি অসহ্য হয় তাহলে দেওয়া দরকার- ক্যামোমিলা ৬।

জরায়ু ‍মুখ কুঁচকে আছে তাই প্রসবে কষ্ট এরকম লক্ষণে- জেলসিমিয়াম ৩০।

প্রসব বেদনা যথার্থ না হয়ে যদি কৃত্রিম হয় তাহলে দিতে হবে- কলোফাইলাম ৩।

জরায়ু মুখ ছড়িয়ে না পড়লে ও শক্ত হলে- বেলেডোনা ৩০।

গর্ভিনীর যদি হিস্টিরিয়া থাকে তাহলে দেওয়া উচিত- ইগ্নেসিয়া ৬।

মুখ-চোখ লাল, প্রলাপ, প্রচন্ড অস্থিরতা লক্ষণে- বেলেডোনা ৩০।

শিশুর মাথা প্রথমে বের হবার আশংকা দেখা দিলে- পালসেটিলা ৩০।

নাড়ী ক্ষীণ, হিমাঙ্গ/শীতল অবস্থা, মূর্ছা প্রভৃতি লক্ষণে- ক্যাম্ফার।

খুব বেশি আক্ষেপ দেখা দিলে- হায়োসায়েমাস ৬।

প্রসবের পর ফুল পড়ার সমস্যা দেখা দেয় অনেক প্রসূতির ক্ষেত্রে। যদি ১ ঘন্টার মধ্যে ফুল না পড়ে তাহলে চিকিৎসা করনো দরকার।

এরকম হলে ১৫ মিনিট পর খাওয়ানো দরকার- সিকেলি ৩০ বা পালসেটিলা ৩০।

এতে যদি কাজ না হয় তবে হাত দিয়ে বের করে দিতে হবে ফুলটাকে। আশপাশের গৃহিণীদের অনেকেরই এ অভিজ্ঞতা থাকে, কাজটা তাদের দিয়েই করানো উচিত। কাছাকাছি ধাত্রী পাওয়া গেলে আরও ভালো হয়। আনাড়ী হাতে এ কাজ করতে যাওয়া মোটেই উচিত নয়।

 

যোনিমুখের ছিন্নতাঃ প্রসবকালে যোনিমুখে অল্প-বিস্তর ছিড়ে যায়। এতে ভয় পাবার কিছু নেই। বেশির ভাগ প্রসূতির ক্ষেত্রেই এমন হয়ে থাকে। এ অবস্থায় কোনো ওষুধ খাওয়াবার দরকার নেই, তবে ওষুধ লাগানো দরকার।

লাগাবার ওষুধ- ক্যালেন্ডুলা Q। অল্প পানির সঙ্গে সামান্য ওষুধ মিশিয়ে ন্যাকড়া বা তুলা ভিজিয়ে পট্টি দিয়ে রাখলে উপকার হয়।

 

ফুল পড়ার পরে ব্যথাঃ ফুল পড়ার পরে একটা ব্যথা অনুভূত হয়, একে বলা হয় হেতাল ব্যথা। ফুল পড়বার পরে জমাট রক্ত বের হবার সময় এমন হয়। দু’দিন বা ৪৮ ঘন্টার মধ্যেই ব্যথা কমে যায়। কিন্তু যদি না কমে তাহলে ওষুধ খাওয়ানো দরকার।

এ অবস্থায় ওষুধ- আর্নিকা ৩০।

এতে কাজ না হলে- সিকেলি ৩০ বা জেলসিমিয়াম ৩x।

 

প্রসবের পরে রক্ত পড়াঃ ফুল পড়ার পর থেকে ৩ সপ্তাহ ধরে জরায়ু থেকে একটু একটু রক্ত পড়ে। একে বলে ‘রক্তডাঙ্গা’। প্রথম ‍দুই দিন টকটকে লাল রক্ত, তারপর হলদে রঙের ও শেষে পানির মতো পাতলা স্রাব হয়। সাধারনত এই ভাবেই রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু বন্ধ যদি না হয় তাহলে ওষুধের ব্যবস্থা করা উচিত।

বেশিদিন ধরে এরকম হতে থাকলে- স্যাবাইনা ৩০ বা সিকেলি ৩।

লাল টকটকে রক্ত পড়লে- ইপিকাক ৩x।

রক্তস্রাব যদি বেশি পরিমাণে হয় তাহলে দিতে হবে- ক্যালক্যারিয়া কার্ব ৬।

রক্ত পড়া যদি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় তাহলে দেওয়া দরকার- অ্যাকোনাইট ন্যাপ ৩x।

সব ওষুধ যদি ব্যর্থ হয় তাহলে দেয়া উচিত- সালফার ৩০।

ওষুধ দ্বারা প্রতিদিন স্ত্রী-জননেন্দ্রিয় ধুয়ে ফেলা দরকার। ওষুধ- ক্যালেন্ডুলা Q। পানির সঙ্গে ওষুধ মিশিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। এক্ষেত্রে কমপক্ষে ২০ গুন পানি ব্যবহার করা উচিত।

 

প্রসবের পরে রক্তস্রাবঃ প্রসবের সময় বেশি রক্ত পড়ে না, কিন্তু প্রসবের পরে রক্ত পড়ে বেশি পরিমাণে। এই রকম অবস্থা হলে প্রসূতির জীবন সংশয় অবস্থা দেখা দিতে পারে।

এক্ষেত্রে খাওয়ানো দরকার- স্যাবাইনা ৩x, হ্যামামেলিস ৩x বা ইপিকাক ৩x।এগুলোর মধ্যে যেকোন একটি ওষুধ সেব্য।

অতিরিক্ত রক্তস্রাবের জন্য যদি রোগিনী অবসন্ন হয়ে পড়ে তাহলে দেওয়া উচিত- চায়না ৬।

 

প্রসবের পরে মূর্ছাঃ অনেক সময় প্রসূতির প্রসবের পরে মূর্ছা হয় অর্থাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়ে। অনেকে আবার প্রসবকালের আগেই মূর্ছা যায়। এ সময়ে মূর্ছা খুবই আশঙ্কাজনক।

অনতিবিলম্বে চিকিৎসা করনো দরকার। কি কারণে মূর্ছা হচ্ছে তা ভালো করে জেনে নিয়ে ওষুধ প্রয়োগ করা উচিত। ঠিকমত ওষুধ প্রয়োগ করলে রোগটা সেরে যেতে পারে।

আঘাত লাগার জন্য এমন হলে- আর্নিকা ৩।

ভয় পেয়ে মূর্ছা হলে- কফিয়া ৬।

মূর্ছা ও তৎসহ হিমাঙ্গ অবস্থা হলে- বেরিনীল ক্যাম্ফার।

বক্ষ-স্থলে চাপবোধ ও তৎসহ মূর্ছা হলে- পালসেটিলা ৬।

ঘন ঘন মূর্ছা, মূর্ছা দীর্ঘস্থায়ী হলে- স্ট্যামোনিয়াম ৩x।

রক্তস্রাব জনিত কারণে মূর্ছা হলে- চায়না ৬।

 

প্রসবের পরে আক্ষেপঃ অনেক নারীর প্রসবের পরে খিঁচুনি বা আক্ষেপ দেখা দেয়। ধনুষ্টংকারের রোগীর মতো সারা শরীরে বা শরীরের কোনো কোনো অংশে এ ধরনের খিঁচুনি হতে পারে। রোগটা খুবই ভয়ের।

ঝিমিয়ে পড়া, হাত-পায়ে খিল ধরা, দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পাওয়া, মাথা ধরা, কথা জরিয়ে আসা, চোখ-মুখ লাল হওয়া, পেটে বেদনা, তন্দ্রা-ভাব, অস্থিরতা, প্রবল জ্বর, পিপাসা, কাঁপুনি, জরায়ুতে বেদনা প্রভৃতি অন্যান্য লক্ষণ। লক্ষণ ‍বুঝে সঠিক ওষুধ নির্বাচন করে রোগীকে খাওয়ালে রোগী আরোগ্যলাভ করে সত্বর।

এ রোগের প্রথম অবস্থায় জ্বরও হতে পারে। মাথা ভারী বা মাথার মধ্যে দপদপ করতে পারে। চিকিৎসককে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে সঠিক কারণ খুঁজে বের করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী চিকিৎসা চালাতে হবে।

মাথার রোগ, চোখ-মুখ লাল, অস্থিরতা, স্তনে দুধ থাকে না বা কম থাকে প্রভৃতি লক্ষণে- বেলেডোনা ৩।

তন্দ্রা-ভাব সহ খিঁচুনিতে- জেলসিমিয়াম ১x।

জরায়ু প্রদাহ, সান্নিপাতিক জ্বর, দীর্ঘস্থায়ী দুর্গন্ধ স্রাবে- রাসটক্স ৬।

পেট ফাঁপাসহ রোগ হলে- ল্যাকেসিস ৬।

দূষিত রক্তের কারণে খিঁচুনি হলে- পাইরোজেন ৬-২০০।

জরায়ুর রোগজনিত কারণে এরকম হলে- নাক্সভমিকা ৩০।

জ্বর, পিপাসায় শীত, কাঁপুনি, গা শুকনো, জরায়ুতে বেদনা সহ খিঁচুনিতে- ভিরেট্রাম ভিরিডি১ বা অ্যাকোনাইট ন্যাপ ৩x।

 

সূতিকা রোগঃ এ রোগটা হয়ে থাকে রক্তাল্পতার কারণে। ঘুসঘুসে জ্বর, উদরাময়, রক্তহীনতা, শোথ প্রভৃতি উপসর্গ দেখা দিলেই বুঝতে হবে রোগটা ‘সূতিকা’। এ ধরনের রোগিনীকে শিঙ্গি মাছের ঝোল ও লঘু পুষ্টিকর খাদ্য খাওয়াতে হবে। পাতলা করে গরম দুধও খাওয়ানো চলতে পারে। কোনো প্রকার গুরুপাক বা ‍উত্তেজক খাদ্য খাওয়ানো রীতিমত ক্ষতিকর।

এ রোগের ওষুধ- ফেরাম ফস ৩০ বা ক্যালক্যারিয়া ফস ৩।


আজকের আলোচনা এখানেই শেষ করলাম। আশা করি, বুঝতে পেরেছেন। নতুন কোনো স্বাস্থ্য টিপস নিয়ে হাজির হবো অন্য দিন। সবাই সুস্থ্য, ‍সুন্দর ও ভালো থাকুন। নিজের প্রতি যত্নবান হউন এবং সাবধানে থাকুন।

এই পোস্টটি যদি আপনার ভালো লাগে এবং প্রয়োজনীয় মনে হয় তবে অনুগ্রহ করে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না যেন।

 

[বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যগুলো কেবল স্বাস্থ্য সেবা সম্বন্ধে জ্ঞান আহরণের জন্য। অনুগ্রহ করে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ সেবন করুন। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবনে আপনার শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি হতে পারে। প্রয়োজনে, আমাদের সহযোগিতা নিন। আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ।]

অ্যাডমিনঃ

আপনাদের সাথে রয়েছি আমি মোঃ আজগর আলী। ছোট বেলা থেকেই কম্পিউটারের প্রতি খুব আগ্রহ ছিল। মানুষের সেবা করারও খুব ইচ্ছে। আর তাই গড়ে তুলেছি স্বাস্থ্য সেবা বিষয়ক ওয়েবসাইট সানরাইজ৭১। আশা করছি, আপনারা নিয়মিত এই ওয়েবসাইট ভিজিট করবেন এবং ই-স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণ করবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     আরও পড়ুন:

সাম্প্রতিক পোস্টসমুহ

আজকের দিন-তারিখ

  • রবিবার (বিকাল ৪:৩৯)
  • ২২শে নভেম্বর ২০২০ খ্রিস্টাব্দ
  • ৬ই রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরি
  • ৭ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ (হেমন্তকাল)