আজ রবিবার,৭ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ,২২শে নভেম্বর ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

www.sunrise71.com

বায়োক্যামিক চিকিৎসায় ব্যবহৃত ১২টি লবণ (ওষুধ) ও তাদের কাজ এবং প্রয়োগক্ষেত্র

বায়োকেমিক ওষুধ ও প্রয়োগক্ষেত্র


 

আমরা অনেকেই দেখি, হোমিওপ্যাথি ডাক্তার;রা প্রায় ক্ষেত্রেই বায়োক্যামিক ওষুধ-ও প্রয়োগ করেন রোগীর উপর। আসলে বায়োক্যামিক আর হোমিওপ্যাথিক অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। দুটি পদ্ধতিরই অনেক সাদৃশ্য রয়েছে। সবচেয়ে বড় সাদৃশ্য হচ্ছে দুটি নীতিতেই লক্ষণ ভিত্তিক চিকিৎসা করা হয়। আজ বায়োক্যামিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে ব্যবহৃত সবগুলো ওষুধ (১২ টি লবণ) সম্পর্কে  সানরাইজ৭১ এ আলোচনা করা হলো।


 

১। ক্যাল্কেরিয়া ফ্লোরিকাম (CaF2)

(ক্যালসিয়াম ফ্লোরাইড)

(ফ্লোরাইড অব লাইম)

এই ওষুধটি হলো এক প্রকার সহজলভ্য খনিজ পদার্থ যা স্ফটিকের ন্যায় স্বচ্ছ ও নানা রঙ এর নানা আকারে পাওয়া যায়। এটা পানিতে দ্রবীভূত হয়। বিশুদ্ধ ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড সাধারনত বিচুর্ণ পদ্ধতিতে প্রস্তুত করার পর ওষুধরুপে বাজারে ছাড়া হয়।

এই ওষুধটি দেহস্থ অন্ডলালা নামক পদার্থের সাথে মিশ্রিত হয়ে মাংশ পেশীর মাঝে স্থিতিস্থাপক সুত্র, অস্থির আবরণ ও সংযোগ টিস্যু তৈরী করে তন্তু ও শিরার গাত্রে অবস্থান করে। এটার অভাবে শরীরে বিভিন্ন লক্ষণ দেখা যায়। যেমন, (১) শরীরের কোন স্থানের শিথিলতা, (২) কোন কোন স্থানে পাথরের মতো কাঠিন্যতা ইত্যাদি।

অন্ড লালার সাথে মিশ্রিত হয়ে এটা দাত ও অস্থির উপরস্থ আবরণ সৃষ্টি করে। দন্ত ও অস্থির মতো এটা শিরা, ধমনী ও চামড়ার উপরিভাগে বিভিন্ন ক্রিয়া প্রকাশ করে।

এটার অভাবে শিরা ও ধমনীর স্থিতিস্থাপক তন্তু কোন রসবাহী প্রনালী অথবা সংযোজক তন্তুতে রক্ত ও রক্তস্থ কঠিন পদার্থাদি অশোধিত হতে পারে না ফলে ঐ সব স্থানে স্ফীতি জন্মে। স্ফীতির ফলে স্থিতিস্থাপক তন্তু সমুহ শিথিল ভাব ধারন করে।

অস্থির আবরণে এটার অভাব হলে অস্থির উপর ক্ষত সৃষ্টি হয় এবং টিউমার (অর্বুদ/আব) উৎপন্ন হয়। এই জন্য শরীরের যে কোন যন্ত্রে যেকোন রোগ হোক না কেন,যদি পাথরের মতো কঠিন হয় তাহলে এটার অভাব জনিত ক্রিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ নিদর্শন বলে জানা যায় এবং উক্ত লক্ষণে এই ঔষধ কখনও বিফল হয় না।

সকল পীড়ায় গরমে ভাল থাকে ঠান্ডায় ও সঞ্চালনে সবগুলো লক্ষণের বৃদ্ধি পায়।

জরায়ুর শিথিলতা এবং তার জন্য রক্ত স্রাব, গর্ভস্রাব, ভেদাল বেদনা, জরায়ুর স্থানচ্যুতি, চোখের ছানি, হার্নিয়া, স্রাবী-অস্রাবী সকল প্রকার অর্শে, হাইড্রোসিল বা অন্ডকোষে পানি বৃদ্ধি এবং তা শক্ত, অন্ডকোষের শীর্ণতা, কটিবাত, সর্দি ও কাশিতে, রক্তস্বল্পতায়, স্বরভঙ্গ, কোষ্ঠকাঠিন্য, দন্ত ক্ষয়, অস্থির অর্বুদ, স্নায়ূশূল ও অঞ্জনি প্রভৃতি রোগে এই ওষুধটি অত্যন্ত সফলতার সাথে ব্যবহৃত হয়।


 

২। ক্যালকেরিকা ফসফরিকাম

(CaHPO4, 2H2O CaHO4, 2H2O)

(ফসফেট অফ লাইম, ক্যালসিয়াম ফসফেট)

(অ্যান্টি-সোরিক, অ্যান্টি-সাইকোটিক, অ্যান্টি-টিউবারকুলার)

ডাঃ হেরিং সর্ব প্রথম চুনের জলের মধ্যে ডাইলিউট ফসফরিক এসিড ক্রমশ মিশ্রিত করে এক প্রকার শ্বেতবর্ণ তলানী প্রস্তুত করেন। পরে তা পরিশ্রুত পানিতে উত্তমরূপে ধৌত ও জলীয় উত্তাপে শুষ্ক করে ওষুধরুপে ব্যবহার করেন। এই ওষুধ পানি অথবা অ্যালকোহলে দ্রবীভূত হয় না।

দেহস্থ অন্ড লালাবৎ পদার্থ সহযোগে এটা ক্যালসিয়াম ফসফেট সঠিক ভাবে সরবরাহ করে। দেহের সব কোষেই এটার উপস্থিতি আছে (হাড়ের কোষে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে) এবং নতুন কোষ নির্মাণে এটা খুবই প্রয়োজনীয় একটা উপাদান।

শিশু জন্ম নেওয়ার পর যখন তার হাড় অপুষ্ট থাকে তখন এই ওষুধ ব্যবহারে শিশুর অপুষ্ট হাড় পুষ্ট হয়। এই ওষুধ পাকস্থলীর উপর তীব্র ক্রিয়া প্রকাশ করে।

গ্রীষ্ম কালে, উষ্ণ গৃহে প্রবেশ করলে, স্থিরভাবে শয়নে রোগ লক্ষণ উপশমিত হয় অর্থাৎ কমে যায়। বর্ষাকালে, ঋতু পরিবর্তনে, ঠান্ডায় ও সঞ্চালনে রোগ বৃদ্ধি পায়।

বালক ও বয়স্ক লোকের হাড় ভেঙে গেলে এই ওষুধ ব্যবহারে হাড় জোড়া লেগে যায়, স্ত্রী লোকের কামোম্মাদ, শিশুদের দন্তোদগমকালীন উদরাময়, জ্বর, তড়কা প্রভৃতি উপসর্গে মন্ত্রের ন্যায় কাজ করে এই ওষুধ।

অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতা, হরিৎ পান্ডু, বৃদ্ধ লোকেদের মাথা ঘোরা, ছাত্র-ছাত্রীদের শিরঃপীড়া তৎসহ কপালে ঘাম, মুত্র গ্রন্থিতে বেদনা, অত্যন্ত গরম প্রস্রাব, অন্ডকোষের বেদনা এবং কোন রোগ ভোগের পর এটার ব্যবহার অপরিহার্য। সবুজ বর্ণ, পিচ্ছিল ও দুর্গন্ধ যুক্ত তরল উষ্ণমল বায়ু সহ নির্গত হলে এর অভাব রয়েছে (ওষুধটির) বোঝা যায়।

ওষুধটির নিম্নক্রম অনেক দিন ধরে ব্যবহার করা উচিৎ নয়। এতে ক্ষতি হবার সম্ভাবনা থেকে যায়।


 

৩। ক্যালকেরিয়া সালফিউরিকম (CaSo4, 2H2O)

(ক্যালসিয়াম সালফেট)

(সালফেট অব লাইম)

(জিপসাম, প্লাষ্টার অব প্যারিস)

এটা এক প্রকার শ্বেত বর্ণের ও দানাদার পদার্থ। এটা ক্যালকেরিয়া মিউরেটিকা সলিউশনের সাথে ডাইলিউটিড সালফিউরিক এসিড মিশ্রিত করে দুগ্ধ শর্করা সহযোগে ওষুধরুপে ব্যবহৃত হয়।

এই ওষুধের ক্রিয়া শরীরের সব সিরাস-ঝিল্লি, শ্লৈষ্মিক-ঝিল্লি, সকল স্থানের ক্ষত, টিউবার কুলার ক্ষত ইত্যাদির উপর দেখা যায়। টিসু মধ্যস্থ অকেজো পদার্থ সমুহকে বের করে দেওয়াই এই ওষুধের মূল কাজ।

শুষ্ক উত্তপ্ত বায়ু ও উন্মুক্ত বায়ুতে ভাল থাকে এবং ঠান্ডায়, ঠান্ডা জলে ও ঋতু পরিবর্তন কালে সমস্ত রোগ লক্ষণ বৃদ্ধি পায়।

এই ওষুধের রোগীর মনের মতলব কোন সময়ই ঠিক থাকেনা। অত্যন্ত অস্থির ও ভুলো মনের হয়। শিশুদের মাথায় ক্ষত ও হলুদ বর্ণের পুঁজ বের হয়। মাথা চুলকালে চুলের গোড়া দিয়ে রক্ত বের হয়। চক্ষু প্রদাহ সৃষ্টি হয়। অবিরত সর্দি ঝরে তৎসহ রক্তের ছিটা দেখা যায়।

খাওয়ার পর পাকস্থলিতে জ্বালা বৃদ্ধি পায়। দাঁতের গোড়া থেকে রক্তপাত, যকৃতের উপর স্ফোটক, গুহ্যদ্বার দিয়ে পুঁজ কিংবা রক্তপাত, মুত্র রোগ, মুত্র নালির প্রদাহ, ঘা ও লালবর্ণ মুত্র, প্রমেহ পীড়ায় পুঁজ নিঃসরণ, অনিয়মিত ঋতুস্রাব, শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট, বক্ষে বেদনা হলে এই ওষুধ বিশেষ উপযোগী।

পীড়ার নাম যেটাই হোক না কেন যদি হলুদ বর্ণের গাঢ় পুঁজ স্রাব এবং ঐ স্রাব যদি বহু দিন থেকে বের হবার ইতিহাস থাকে তবে নিশ্চিন্ত মনে এই ওষুধ ব্যবহার করা যায়।


 

৪। ফেরাম ফসফরিকম (FePo4, 4H2O)

(ফসফেট অব আয়রন)

(অ্যান্টি-সোরিক এবং অ্যান্টি-টিউবারকুলার)

ফসফেট অব সোডিয়াম ও ফসফেট অব আয়রন এই দুটি পদার্থের সংমিশ্রনে এই ওষুধ প্রস্তুত করা হয়। মূলত বিশুদ্ধ ফসফেট অব আয়রন থেকে দুগ্ধ শর্করা সহযোগে এই ওষুধ প্রস্তুত করা হয়।

সঞ্চালনে বেদনা, মুক্ত বায়ুতে কাশি, রাত্রিতে বা ভোর ৪ টা হতে ৬টা পর্যন্ত যে কোন পীড়ার/রোগের বৃদ্ধি হলেই এই ওষুধ ব্যবহার করা যায়।

বায়োক্যামিক চিকিৎসায় এই ওষুধের ব্যবহার এত বিস্তৃত যে ভাবতেও অবাক লাগে। এটা মানুষের শরীরে প্রতি লিটার রক্তে প্রায় আধা গ্রেণ পরিমাণে বিদ্যমান রয়েছে।

রক্তে (হিমোগ্লোবিন) রক্ত নালী সমুহ, পেশী এবং সন্ধি সমুহের তন্তু, পাকস্থলী, নাড়ী-ভুড়ি ও জরায়ুর উপর এর প্রধান ক্রিয়া ক্ষেত্র বিদ্যমান।

প্রদাহ, প্রদাহ জনিত রোগ, রক্তস্রাব, কপালের উভয় লালবর্ণ এবং চোখের পাতা ভারী বোধ, অত্যন্ত জ্বর, কানে সূঁচ ফোঁটার মতো ব্যথা, রক্তের আধিক্যের জন্য কালা, রোগী কিছুই শুনতে পায় না, আঘাতের ফলে রক্তপাত, মুখ মন্ডল লাল হয় চোখ ছলছল করে, পাকস্থলীতে জ্বালা-বোধ, গলার মধ্যে ব্যথা, গিলতে কষ্ট হয়, অনিচ্ছায় মুত্রপাত, অর্শ্ব রোগের জন্য রক্তপাত, মলদ্বারে ব্যথা, রক্ত শুন্যতা, শ্বেত প্রদর, পেশী ও সন্ধি সমুহের বাত, দন্ত-বেদনা সহ প্রভৃতি রোগে এবং লালবর্ণের রক্ত স্রাবে এটা অব্যর্থ ওষুধ।

জ্বরের প্রাথমিক অবস্থায় ৬ শক্তির এই ওষুধ ১০/১৫ মিনিট পরপর তাপমাত্রা না কমা অবধি ব্যবহার করা যায়। এই ওষুধ রাত্রীকালে ব্যবহার না করাই উত্তম। ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। ছাত্র-ছাত্রীগণ রাত জেগে পড়াশুনার জন্য অনেক সময় এটা ব্যবহার করেন।


 

৫। কেলি মিউরিয়েটিকাম (KCl)

(পটাসিয়াম ক্লোরাইড)

বিশুদ্ধ পটাসিয়াম ক্লোরাইড দুগ্ধ শর্করা সহযোগে চুর্ণ প্রস্তুত করে এটি তৈরী করা হয়।

দেহস্থ অন্ডলালাবৎ পদার্থের সাথে মিশ্রিত হয়ে এটা শরীরস্থ ফাইব্রিন নামক পদার্থ সৃষ্টি করে। পটাসিয়াম ক্লোরাইড- কর্নিয়া, মধ্য কর্ণ, শ্লৈষ্মিক ঝিল্লি, লসিকা গ্রন্থি, ফুসফুস, বক্ষাবরক-ঝিল্লি, অন্তাবরক-ঝিল্লি, সন্ধির মাস্তক-ঝিল্লি প্রভৃতির উপর ক্রিয়া প্রকাশ করে।

সকল প্রকার প্রদাহিক পীড়ায় ক্ষতের স্রাবে এরই অস্তিত্ব পাওয়া যায়। পাংশু বা শ্বেতবর্ণ ময়লা যুক্ত জিহ্বা এই ওষুধের অভাব নির্দেশ করে।

ফেরাম ফস যে রূপ প্রদাহিক পীড়ায় প্রথম অবস্থায় উপযোগী তদ্রুপ কেলি মিউর দ্বিতীয় অবস্থায় উপযোগী। যে কোন স্থানের স্রাব যদি গাঢ় শ্বেতবর্ণ আঠাযুক্ত হয় তাহলে এই ওষুধ ব্যবহার করা হয়।

তৈলাক্ত খাদ্য ও অন্যান্য গুরুপাক দ্রব্য আহারে পেটের পীড়ার বৃদ্ধি, ঠান্ডা লেগে সর্দি, উজ্জ্বল আলোতে ও ঠান্ডায় চক্ষুর পীড়ার বৃদ্ধি হয়ে থাকে। ধীরভাবে শুয়ে থাকলে ও উষ্ণ স্বেদ লাগালে পীড়ার উপশম হয়।

সকল প্রকার চক্ষুর পীড়ায়, কানের ব্যথা, ডিপথেরিয়া, অজীর্ণ, উদরাময় প্রভৃতি রোগে যদি জিহ্বার লক্ষণ দেখা যায় তবে কেলি মিউর-ই উপযোগী।

মাথার ক্ষত, সাদা মামড়ি পড়ে, চক্ষুর পাতায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দানা দানা উদ্ভেদ ও সাদা পুঁজ, কানে ব্যথা ও বধিরতা, সর্দি, গাঢ় সাদা শ্লেষ্মা বের হওয়া সহ এটা রক্ত আমাশয়, প্রমেহ ও সফ্ট শ্যাঙ্কার পীড়ার প্রধান একটি ওষুধ।

যকৃত, মুত্র যন্ত্র ও হৃৎপিন্ডের বিকৃতি বশতঃ শোথ, শোথাক্রান্ত স্থান উজ্জ্বল শ্বেতবর্ণ, ঘুংড়ি ও হুপিং কাশি, শ্বেত প্রদর, সুতিকা-জ্বর, দুগ্ধজ্বর, বাতজ্বর, বয়োব্রণ, হাম, বসন্ত সহ ইত্যাদি রোগে কেলিমিউর মন্ত্রের ন্যায় কাজ করে।

ইহার তৃতীয় মাত্রা শ্বেত প্রদর রোগে নিশ্চিন্ত মনে ব্যবহার করা যায়।


 

৬। কেলি ফসফরিকম (K2HPO4)

(ফসফেট অব পটাশ)

(অ্যান্টি-সোরিক ও অ্যান্টি-টিউবারকুলার)

পটাশিয়াম হাইড্রেটের সাথে ফসফরিক অ্যাসিডের জলীয় দ্রবণ মিশ্রিত করে তাপ প্রয়োগে পানি দূর করে এই ওষুধ প্রস্তুত করা হয়। বিশুদ্ধ ফসফেট অব পটাস দুগ্ধ অন্ডালালার সাথে মিশিয়ে কেলি ফস মস্তিস্কের ‘গ্রে-ম্যাটার’ নামে পদার্থ তৈরী করে।

মস্তিস্কের ‘গ্রে-ম্যাটার’, স্নায়ু এবং মাংশ পেশীতে কেলি ফস প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। টিস্যু গঠনের জন্য কেলি ফস শ্রেষ্ঠ একটি ওষুধ। স্নায়ু মন্ডলের উপর এটা বিশেষ ভাবে ফলপ্রদ। সকল প্রকার দৌর্বল্যে কেলি ফস-ই প্রধান ওষুধ হিসেবে ব্যবহার হয়।

সামান্য কারণে বিরক্ত হওয়া, অত্যন্ত অবসন্নতা, তেজহীনতা ও অস্থিরতা, স্মরণ শক্তি হ্রাস, মস্তিস্কের ক্লান্তি, সংজ্ঞাহীনতা, প্রলাপ বকা, রোগী বিশ্বাস করে না, কোন প্রকার চিন্তা করতে পারে না সহ ইত্যাদি লক্ষণেও এই ওষুধ প্রচুর পরিমাণে ব্যবহার করা হয়।

প্রাতঃকালে, নির্জনতায়, অধিক সঞ্চালনে ও ঠান্ডা বাতাসের সংস্পর্শে রোগ বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়।

মানসিক পীড়া, উন্মাদ, হিস্টিরিয়া, অতিরিক্ত শুক্রক্ষয়, অনিদ্রা, মুখের ক্যান্সার, কলেরা, শূল বেদনা, টাইফয়েড জ্বর, শ্বেত প্রদর, শিরঃপীড়া, অতিরিক্ত ধাতুস্রাব, স্নায়ুবিক কারণ হেতু মধুমেহ, ধাতু-দৌর্বল্য, যন্ত্রণাযুক্ত একজিমা, পৃষ্ঠ বেদনা ইত্যাদি সহ যে কোন প্রকার পক্ষাঘাত এর জন্য এটাই শ্রেষ্ঠ ওষুধ হিসেবে বিবেচ্য।

যে কোন প্রকার জ্বর বিকার দেখা দিলে কেলিফস-৬ কয়েক মাত্রা দিলেই আশ্চর্যজনক ফল পাওয়া যায়। এই ওষুধের নিম্নক্রমে বেশী ফল হয়।


 

৭। কেলি সালফিউরিকম (K2SO4)

(পটাশিয়াম সালফেট)

(অ্যান্টি-সোরিক, অ্যান্টি-টিউবারকুলার)

এটা সাধারনত আগ্নেয়গিরিতে উৎপন্ন হয়। এটার ৪-৬টি কোণ থাকে এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দানা বিশিষ্ট বর্ণহীন ও শক্ত হয়। এটার স্বাদ লবণাক্ত, তিক্ত ও ঝাঁঝ যুক্ত। মূল ওষুধ দুগ্ধ শর্করা যোগে ওষুধার্থে ব্যবহৃত হয়।

ক্যালি সাল্ফ শরীরের এপিডার্মিস বা চামড়ার উপরের পাতলা আবরণ ও পিথিলিয়ামের উপর কাজ করে। রক্তস্থ লৌহময় পদার্থ ও শরীরের তৈলাক্ত পদার্থের সাথে এটা মিশ্রিত হয়ে শরীরের সর্বত্র অক্সিজেন সরবরাহ করে। শরীরের তৈলাক্ত পদার্থের উপর এটার বিশেষ প্রভাব আছে। এই ওষুধকে বলা হয় প্রদাহের শেষ অবস্থার ওষুধ।

সর্ব প্রকার স্রাবই পিচ্ছিল ও আঠা-আঠা বা চটচটে এবং হলুদ বা সবুজ বর্ণের এবং জিহ্বার উপর হলুদ বর্ণের পিচ্ছিল ময়লা জমলে এই ওষুধের অভাব অনুভব করা যায়।

স্নায়ুশূল, বাত অথবা যে কোন প্রকারের বেদনা-ই হোক না কেন যদি বেদনা স্থান পরিবর্তনশীল হয় তবে এই ওষুধ উপযোগী।

বসন্ত বা হাম রোগে দানা সকল বসে গেলে এই ওষুধ প্রয়োগে পুণরায় বের হয়ে রোগী চিকিৎসার যোগ্য হয়। শ্বেত প্রদর হলুদাভাব, হলুদ সর্দি স্রাব, সর্দি বসে শিরঃপীড়া স্রাব, পীড়া লক্ষণের হ্রাস-বৃদ্ধি, লুপ্ত উদ্ভেদের পুনরুথ্যান ক্ষমতা, শুষ্ক ও খসখসে চামড়া মসৃণ করবার ক্ষমতা এবং বেদনার প্রকৃতি এই পাঁচটি বিষয় স্মরণ রাখলে এই ওষুধের যাবতীয় রোগের চিকিৎসা সহজ হয়ে যায়।

সন্ধ্যাকালে, উত্তপ্ত রুদ্ধ গৃহে পীড়া লক্ষণের বৃদ্ধি এবং মুক্ত শীতল বাতাসে, মধ্য রাতের পর ও সকল প্রকার শীতলতায় পীড়া লক্ষণের আরাম হওয়া কেলি সালফের প্রধান প্রয়োগ লক্ষণ।

শিরঃপীড়া, খুস্কি, চক্ষু প্রদাহ, কর্ণ প্রদাহ, মুখ-মধ্যে জ্বালা, ওষ্ঠে ক্যান্সার, সর্দি, অর্শ, অজীর্ণ, প্রমেহ, মুত্রাশয় প্রদাহ, বাত, হাম, বসন্ত, শ্বেত প্রদর, শ্বাস যন্ত্রের প্রদাহ প্রভৃতি রোগের জন্য এই ওষুধ অত্যন্ত ফলপ্রদ।


 

৮। ম্যাগনেশিয়াম ফসফরিকাম

(MgHPO4, 7H2O)

(ফসফেট অব ম্যাগনেশিয়া)

ফসফেট অব সোডা ও সালফেট অব ম্যাগনেশিয়া একত্রে মিশ্রিত করে এই ওষুধ প্রস্তুত করা হয়। পানিতে আংশিক দ্রবীভুত হয় কিন্তু উত্তাপে পুনরায় জমাট বেঁধে যায়। দুগ্ধ শর্করা সহযোগে এটার বিচুর্ণ প্রস্তুত হয়।

শরীরস্থ অন্ডলালিক পদার্থের সাথে ম্যাগ ফস মিশ্রিত হয়ে স্নায়ু ও পেশীর শ্বেত বর্ণের সুত্র প্রস্তুত করে। যখন এটার অভাব ঘটে তখনই উক্ত শ্বেত সুত্র সমুহের সংকোচন ঘটে এবং সংকোচনই আক্ষেপ। ম্যাগ ফসই সর্ব প্রকার আক্ষেপ বা শূল বেদনার এক নম্বর ওষুধ হিসেবে বিবেচ্য।

কেন্দ্রীয় স্নায়ুমন্ডলী, অন্যান্য স্নায়ু, পেশী সমুহ এবং সকল শুন্য অঙ্গের উপর এটার প্রধান ক্রিয়া বিদ্যমান।

চাপন বা সঞ্চালণ, শীতল বায়ু, আর্দ্র আবহাওয়া, চিৎ হয়ে শয়নে, খোলা জায়গায় ঘুরে বেড়ালে রোগের বৃদ্ধি হয়। সজোরে সঞ্চালনে ও উত্তাপ লাগালে আবার উপশম হয়।

মস্তিষ্কে পীড়া, কর্ণ কুহরে আক্ষেপিক বেদনা, উদরশূল, রক্ত আমাশয়, দৃষ্টি শক্তির ক্ষীণতা, অক্ষিপটে স্পন্দন ও ব্যথা অনুভূত, শিশুদের কোষ্ঠবদ্ধতা, মুত্র পাথরী, ঋতু কালে মহিলাদের কষ্ট, ঋতু রক্ত কাল ঝুলের মতো হওয়া ইত্যাদিও লক্ষণ হিসেবে বিবেচ্য।


 

৯। নেট্রাম মিউর (NaCl)

(সোডিয়াম ক্লোরাইড, খাবার লবণ)

পরিশোধিত সাধারন খাবার লবণ দুগ্ধ শর্করা সহযোগে ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটা শরীরস্থ সমগ্র তরল ও টিস্যুতে বিদ্যমান এবং শরীরের তরল অংশ নিয়ন্ত্রণ করে।

এটার অভাবে কোষ্ঠবদ্ধতা, শিরঃপীড়া, সর্বদা মনমরা, অবসাদগ্রস্থ হয়ে থাকে রোগীরা।

প্রাতঃকালে, গ্রীষ্মকালে, বর্ষাকালে, পূর্ণিমায় এবং কুইনাইন ব্যবহারের পর বৃদ্ধি পায় রোগটি। খোলা বাতাসে, শীতল জলে স্নান করিলে, উদরপূর্ণ আহার না করিলে, কঠিন শয্যায় ও দক্ষিণ পার্শ্বে শয়নে রোগের উপশম হয়।

মস্তিস্ক বেদনা, মাইগ্রেন, মন অতিশয় অবসাদগ্রস্থ, চোখ থেকে জল পড়ে, দৃষ্টি ভ্রম, কর্ণ প্রদাহ, কর্ণে স্ফীতি জনিত বধিরতা, ঠান্ডা লেগে সর্দি, দাতের মাড়ি দিয়ে সামান্য কারণে রক্ত পড়া এগুলো হলো সাধারণ লক্ষণ।

অনিয়মিত ঋতু, স্ত্রী লোকের জননেন্দ্রিয়ের শুষ্কতা, প্রস্রাব করতে গেলে জ্বালা-বোধ, চর্ম পীড়া, নিদ্রাহীনতা বা অতি নিদ্রা। রাতের বেলা প্রগাঢ় নিদ্রা হলে দৈহিক ক্লান্তি মিটে না; প্রাতঃকালে অলসতা জড়িয়ে ধরে এরকম লক্ষণে এই ওষুধ অবশ্য ব্যবহার্য।


 

 

১০। নেট্রাম ফস (Na4HPO4.12H2O)

(ফসফেট অব সোডা)

সোডিয়াম ফসফেট দুগ্ধ শর্করা সহযোগে শক্তিকৃত করে ওষুধার্থে ব্যবহৃত হয়।

এই লাবণিক পদার্থের অভাব ঘটলে মানসিক লক্ষণের ব্যতিক্রম হয়। সর্বদাই মনে উদ্বেগ, উৎকন্ঠা ও খিটখিটে ভাবের উদয় হয়। রক্ত কনিকায়, মাংশ পেশীর স্নায়ু কোষ ও মস্তিষ্কের কোষে ও টিস্যু তরলে এটার অবস্থান দেখা যায়।

সামান্য কারণে মনে ভয়ের সঞ্চার, স্মৃতি শক্তি কমে যায়। কোন কিছু মনে রাখতে পারে না। কর্ণের পীড়ায় কর্ণের পাতায় এত চুলকায় যে ক্ষতের সুষ্টি হয়ে রক্তপাত ঘটে ও হলুদ রং এর পুজঁ নিঃসরণ হয়। দাতের মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়ে ও দাঁত ক্ষয়ে যায়। পেটে কৃমি দেখা দেয় ও বমি সহ জ্বর-জ্বর ভাব দেখা যায়।


 

 

১১। নেট্রাম সালফ (Na2SO4)

সোডিয়াম সালফেট দুগ্ধ-শর্করা সহযোগে শক্তিকৃত করে ওষুধার্থে ব্যবহৃত হয়।

ভিজা আর্দ্র ঘরে বা এলাকায় বসবাসের কারণে যে সকল উপসর্গ দেখা দেয় সেই সব ক্ষেত্রে এই ওষুধ খুবই উপযোগী।

পিত্তের সহযোগে নিঃসরণকৃত পদার্থ যথা সর্দি-কফ, মল-মুত্র, ঘাম সকল হলুদ বর্ণ ধারণ করে। এমন অবস্থা ছাড়াও রক্তপিত্ত জনিত বিবিধ পীড়া যেমন পিত্তজ্বর, স্বল্পবিরাম জ্বর, সবিরাম জ্বর, বহু ব্যাপক সর্দি, বহুমুত্র, পিত্তবমি ইত্যাদি লক্ষণ সাধারণত নেট্রাম সালফ সেবনে বিমুক্ত হয়ে থাকে।


 

১২। সাইলিসিয়া (SiO2.XH2O) সিলিকা

(বালু, কোয়ার্টস, পিওর ফ্লিন্ট)

দুগ্ধ-শর্করা সহযোগে শক্তিকৃত করে ওষুধার্থে ব্যবহৃত হয়।

যে সমস্ত শিশুদের দেহ শীর্ণ বা অপুষ্ট অথচ পেট ও মাথা বড় হয়ে থাকে সাধারনত, যাদের মাথার সংযোগ অস্থি জন্ম নেওয়ার পর সহজে শক্ত হয় না এবং যে সমস্ত রোগ অমাবস্যা ও পুর্ণিমায় বৃদ্ধি পায় সে সমস্ত রোগ দুরীভূত করতে সাইলেশিয়ার দারুণ ক্ষমতা আছে।

মনের মধ্যে সর্বদা বিশৃঙ্খল ভাব, শীত কালে মাথায় খুস্কি ও দাদ দেখা যায়, চক্ষুর পাতায় ক্ষুদ্র আব বা অঞ্জনী, মুখশায়ী গ্রন্থির বেদনা ও স্ফীতি, সামান্য কারণে বা আঘাতে ক্ষত হয়, সহজে শুকাতে চায়না ও অধিক মাত্রায় পুজঁ নিঃসরণ হয়, চোখে নখে নালী ঘা, সর্দি আটকিয়ে চক্ষুর উপরে দক্ষিণ দিকে ব্যথা, শিশুদের স্বাভাবিক কোষ্ঠবদ্ধতা, মল ত্যাগকালে শিশু অত্যন্ত কুন্থন দেয় সহ ইত্যাদি লক্ষণে সাইলিশিয়ার জুড়ি নেই।


 

আজকের আলোচনা এখানেই শেষ করলাম। আবারও নতুন কোনো স্বাস্থ্য তথ্য নিয়ে অন্য দিন হাজির হবো। সবাই সুস্থ্য, ‍সুন্দর ও ভালো থাকুন। নিজের প্রতি যত্নশীল হউন এবং সাবধানে থাকুন।

এই পোস্টটি যদি আপনার ভালো লাগে এবং প্রয়োজনীয় মনে হয় তবে অনুগ্রহ করে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না যেন।

[বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যগুলো কেবল স্বাস্থ্য সেবা সম্বন্ধে জ্ঞান আহরণের জন্য। অনুগ্রহ করে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ সেবন করুন। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবনে আপনার শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি হতে পারে। প্রয়োজনে, আমাদের সহযোগিতা নিন। আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ।]

অ্যাডমিনঃ

আপনাদের সাথে রয়েছি আমি মোঃ আজগর আলী। ছোট বেলা থেকেই কম্পিউটারের প্রতি খুব আগ্রহ ছিল। মানুষের সেবা করারও খুব ইচ্ছে। আর তাই গড়ে তুলেছি স্বাস্থ্য সেবা বিষয়ক ওয়েবসাইট সানরাইজ৭১। আশা করছি, আপনারা নিয়মিত এই ওয়েবসাইট ভিজিট করবেন এবং ই-স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণ করবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     আরও পড়ুন:

সাম্প্রতিক পোস্টসমুহ

আজকের দিন-তারিখ

  • রবিবার (দুপুর ২:০৬)
  • ২২শে নভেম্বর ২০২০ খ্রিস্টাব্দ
  • ৬ই রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরি
  • ৭ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ (হেমন্তকাল)